
কখনো রবীন্দ্রসংগীতের সুরের ব্যাঞ্জনায় অপূর্ব দ্যুতি! কখনো নজরুলসংগীতের মীড় ও গায়কির কারুকাজ। আবার কখনো আধুনিক গান, লোকগীতি, আঞ্চলিক গান কিংবা হিন্দি ও ইংরেজি গানের ভিন্নধর্মী সুরের আবেশ। কণ্ঠে কণ্ঠে নানা রঙের সুরের মূর্ছনায় জমে উঠেছিল সুর, তাল ও লয়ের অনন্য লড়াই। যেন এক মঞ্চে মিলেছিল সংগীতের নানা ধারা, নানা স্বর ও গায়কির বহুমাত্রিক প্রকাশ।

পেশাদার যন্ত্রশিল্পীদের সংগঠন চট্টগ্রাম যন্ত্রশিল্পী সংস্থার আয়োজনে ‘ভয়েস হান্ট সিজন-৩’-এর ফাইনাল রাউন্ড অনুষ্ঠিত হয়েছে। সোমবার (৩১ আগস্ট) সকাল ১০টা থেকে রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত চট্টগ্রাম থিয়েটার ইনস্টিটিউটের গ্যালারি হলে এ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়।
প্রথম রাউন্ডে শতাধিক প্রতিযোগীর মধ্য থেকে বাছাই হয়ে ৪১ জন ফাইনাল রাউন্ডে অংশ নেন। প্রত্যেক প্রতিযোগী বিচারকদের সামনে নিজের কণ্ঠের স্বাতন্ত্র্য তুলে ধরতে বিভিন্ন ঘরানা ও ভাষার গান পরিবেশন করেন।
কারও কণ্ঠে ছিল রবীন্দ্রসংগীতের মাধুর্য, কারও পরিবেশনায় নজরুলসংগীতের গায়কির সৌন্দর্য। আবার কেউ আধুনিক, লোক, আঞ্চলিক, হিন্দি ও ইংরেজি গান পরিবেশনের মাধ্যমে নিজের সংগীতপ্রতিভার বহুমাত্রিকতা তুলে ধরেন।
প্রতিযোগিতায় বিচারকের আসন অলংকৃত করেন দেশসেরা যন্ত্রশিল্পী অভিজিৎ চক্রবর্তী, দীপঙ্কর ভট্টাচার্য (সজল), সংগীত পরিচালক ও কণ্ঠশিল্পী সুব্রত দাশ অনুজ, ব্যান্ডশিল্পী হাফিজ উদ্দিন আহমেদ মুবিন এবং রায়হান আল হাসান।

প্রতিযোগীদের সঙ্গে যন্ত্রসঙ্গতে ছিলেন কিবোর্ডে নিখিলেশ বড়ুয়া, অক্টোপ্যাডে অনুজিত বড়ুয়া লিমন, তবলায় প্রীতম আচার্য্য, বেইস গিটারে তন্ময় বড়ুয়া এবং লিড গিটারে সুচয়ন দে। তাঁদের যন্ত্রসঙ্গতের ছন্দ, তাল ও সুরের মেলবন্ধনে প্রতিযোগীদের পরিবেশনা আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
প্রতিযোগিতা চলাকালে চট্টগ্রাম থিয়েটার ইনস্টিটিউটে উপস্থিত হয়ে আয়োজন উপভোগ করেন চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমির কালচারাল অফিসার আয়াজ মাবুদ, সংগীতশিল্পী রিয়াজ ওয়ায়েজ, সমাজসেবক মিন্টু দাশ ও প্রভাস দে।
তাঁরা প্রতিযোগীদের পরিবেশনা উপভোগ করেন এবং চট্টগ্রাম যন্ত্রশিল্পী সংস্থার এমন ব্যতিক্রমী উদ্যোগের প্রশংসা করেন।
বিচারক ও আয়োজকরা বলেন, এ ধরনের প্রতিযোগিতা শুধু প্রতিভা অন্বেষণের প্ল্যাটফর্ম নয়, বরং তরুণ সংগীতশিল্পীদের সংগীতের বিভিন্ন দিক শেখারও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।
নিয়মিত চর্চা, সঠিক দিকনির্দেশনা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এখান থেকে নতুন নতুন প্রতিভাবান কণ্ঠশিল্পী উঠে আসবে বলে তাঁরা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
প্রতিযোগীরা বলেন, প্রথম, দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয়; যে অবস্থানই হোক না কেন, ‘ভয়েস হান্ট’-এর এ আয়োজন থেকে তাঁরা অনেক কিছু শিখেছেন। সংগীতের সুর, তাল, লয়, উচ্চারণ, পরিবেশনা ও মঞ্চে উপস্থাপনাসহ বিভিন্ন বিষয়ে গ্রুমিং তাঁদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে।
গত ২৬ জুলাই চট্টগ্রাম থিয়েটার ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে ‘ভয়েস হান্ট সিজন-৩’-এর প্রথম রাউন্ড শুরু হয়। এতে শতাধিক প্রতিযোগী অংশ নেন। প্রাথমিক বাছাই শেষে ৪১ জন প্রতিযোগী ফাইনাল রাউন্ডে উত্তীর্ণ হন।
পরবর্তী সময়ে প্রতিযোগীদের সংগীতের বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষ গ্রুমিং করানো হয়। সুর ও তাল-লয়, বিভিন্ন ঘরানার গান, শুদ্ধ উচ্চারণ, মঞ্চে পরিবেশনা, ব্যক্তিত্ব ও উপস্থাপনাসহ বিভিন্ন বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে দক্ষ ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা তাঁদের প্রশিক্ষণ দেন। এমনকি মঞ্চে উপস্থাপনার পাশাপাশি মেকআপ সম্পর্কেও দেওয়া হয় প্রয়োজনীয় ধারণা।
গতকাল (৩১ আগস্ট) সোমবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে ফাইনাল রাউন্ডের প্রতিযোগিতা শেষ হয়। এরপর রাত ১০টার দিকে প্রাথমিকভাবে ১২ জন প্রতিযোগীর নাম ঘোষণা করা হয়। তবে চ্যাম্পিয়ন, প্রথম রানারআপ ও দ্বিতীয় রানারআপের নাম তাৎক্ষণিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি।
আয়োজক কমিটি জানিয়েছে, আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে চট্টগ্রাম যন্ত্রশিল্পী সংস্থার ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ‘ভয়েস হান্ট সিজন-৩’-এর চ্যাম্পিয়ন, প্রথম রানারআপ ও দ্বিতীয় রানারআপের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে।
তবে ফাইনালে অংশ নেওয়া ৪১ জন প্রতিযোগীর প্রত্যেকের হাতে সংগঠনের পক্ষ থেকে সনদপত্র ও বিশেষ পুরস্কার তুলে দেন অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথিরা।
অনুষ্ঠানে ‘ভয়েস হান্ট সিজন-৩’-এর আহ্বায়ক এস. এম. শাজাহান সভাপতিত্ব করেন। সঞ্চালনায় ছিলেন চট্টগ্রাম যন্ত্রশিল্পী সংস্থার সাধারণ সম্পাদক সংকলন বড়ুয়া ও প্রতিযোগিতার সদস্য সচিব রুবেল বড়ুয়া।

এ সময় সঙ্গীত শিল্পী রিয়াজ ওয়ায়েজ, চট্টগ্রাম যন্ত্রশিল্পী সংস্থার সভাপতি হিল্লোল রায়, সাবেক সভাপতি মনোজ সরকার ও লায়ন প্রবীর দত্ত, সাবেক সাধারণ সম্পাদক অসীম চন্দ বাপ্পি, অর্থ সম্পাদক পিযুয সেন, দপ্তর সম্পাদক ডা. দুলাল কান্তি চৌধুরী, প্রকল্প বিষয়ক সম্পাদক রনি বিশ্বাস, প্রচার সম্পাদক পার্থ সারথী বিশ্বাস, সদস্য জগলুল পাশা, রাজীব নন্দী, সংগঠনের সদস্য ও কাপ্তাই প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ঝুলন দত্তসহ সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
সংগীতের নানা সুরধারা, তাল-লয়ের মেলবন্ধন এবং নতুন কণ্ঠের সন্ধানে আয়োজিত ‘ভয়েস হান্ট সিজন-৩’-এর ফাইনাল শেষ পর্যন্ত শুধু প্রতিযোগিতার মঞ্চেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি হয়ে উঠেছিল নতুন প্রতিভাদের শেখা, চর্চা, আত্মবিশ্বাস ও সংগীতচর্চার এক অনন্য আয়োজন।
ঝুলন দত্ত: সিনিয়র রিপোর্টার কাপ্তাই রাঙ্গামটি 




















