
“পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের কৌশলগত ও ভূ-রাজনৈতিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চল। ভৌগোলিক বন্ধুরতা, ঘন জঙ্গল এবং আন্তর্জাতিক সীমানার উপস্থিতির কারণে এখানে দ্রুত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও সামরিক অপারেশন পরিচালনা করা অনেক সময় চ্যালেঞ্জিং হয়ে ওঠে। এই সার্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় রেখে এই প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।”
পার্বত্য চট্টগ্রাম কেবল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার নয়, বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার এক অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত অঞ্চল। ভারতের ত্রিপুরা ও মিজোরাম এবং মায়ানমারের রাখাইন ও চিন রাজ্যের সীমান্ত-সংলগ্ন এই দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর।
সাম্প্রতিক সময়ে মায়ানমারের অস্থিতিশীল অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সীমান্ত সংঘাত, সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমন; সব মিলিয়ে পার্বত্য অঞ্চলে নিরাপত্তার গতিশীলতা নিশ্চিত করতে একটি সামরিক বিমানবন্দরের প্রয়োজনীয়তা অত্যন্ত জোরালো হয়ে উঠেছে।

দুর্গম ভৌগোলিক রূপরেখা ও সামরিক চ্যালেঞ্জ: রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান; এই তিনটি জেলা নিয়ে গঠিত পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূ-প্রকৃতি মূল ভূখণ্ডের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। উঁচু-নিচু পাহাড়, গভীর খাদ ও ঘন জঙ্গলে আবৃত এ অঞ্চলে সড়কপথে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সামরিক রসদ কিংবা জনবল স্থানান্তর করা কেবল সময়সাপেক্ষই নয়, বেশ ঝুঁকিপূর্ণও।
বর্তমানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মূলত হেলিকপ্টারের ওপর নির্ভর করে জরুরি রসদ সরবরাহ ও উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে থাকে। তবে আবহাওয়ার প্রতিকূলতা, ভারী ট্যাংক বা যুদ্ধবিমান পরিচালনা এবং দ্রুত বড় ধরনের প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কেবল হেলিকপ্টারনির্ভরতা যথেষ্ট নয়। একটি পূর্ণাঙ্গ সামরিক বিমানবন্দর বা টেকসই রানওয়ে থাকলে সামরিক বিমান দ্রুত অবতরণ ও উড্ডয়ন করতে পারবে, যা যে কোনো কৌশলগত সংকটে কয়েক ঘণ্টার কাজ কয়েক মিনিটে সম্পন্ন করতে সক্ষম হবে।
সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও সীমান্ত নিরাপত্তা: মায়ানমার সীমান্তে গত কয়েক বছরে যে ধরনের অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে; যেমন সীমান্ত অতিক্রম করে গোলাবর্ষণ বা ড্রোন অনুপ্রবেশ; তা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের ওপর প্রত্যক্ষ হুমকি। আন্তর্জাতিক সীমান্তে নজরদারি জোরদার করতে আধুনিক ড্রোন পর্যবেক্ষণ, দ্রুত প্রতিক্রিয়া দল (Quick Reaction Force) প্রেরণ এবং প্রয়োজনবোধে বিমান বাহিনীর টহল জোরদার করা দরকার।
পার্বত্য চট্টগ্রামে সামরিক বিমানবন্দর গড়ে তোলা পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির সাথে সাংঘর্ষিক। তাই পার্বত্য বান্দরবান জেলার লামা উপজেলা ঘেঁষে চকরিয়া উপজেলার বমুবিলছড়ি ইউনিয়নের ২ নং ওয়ার্ড বিলছড়িতে সামরিক বিমান ঘাঁটি গড়ে উঠলে তা বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর (BAF) কভারেজ এরিয়া বাড়াবে এবং যেকোনো বহিরাগত হুমকি মোকাবেলায় শক্ত অবস্থান তৈরি করবে। অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি লঙ্ঘনের প্রশ্ন তুলতে পারবেনা।
বিচ্ছিন্নতাবাদ ও অভ্যন্তরীণ অপরাধ দমন: পার্বত্য অঞ্চলে সক্রিয় স্থানীয় কয়েকটি বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী ও সশস্ত্র দল দুর্গম পাহাড়ি এলাকার সুযোগ নিয়ে অপতৎপরতা চালায়। এসব গোষ্ঠীর আন্তর্জাতিক সীমান্ত ব্যবহারের সুযোগ বন্ধ করতে আধুনিক আকাশপথের সক্ষমতা প্রয়োজন। একটি সামরিক ঘাঁটির অধীনে রানওয়ে থাকলে তা গোয়েন্দা নজরদারি ও সুনির্দিষ্ট অপারেশনে অভূতপূর্ব গতি এনে দেবে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও মানবিক সহায়তা: নিরাপত্তার পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রাকৃতিক দুর্যোগ একটি নিয়মিত চিত্র। পাহাড়ধস, বন্যা কিংবা আকস্মিক দুর্ঘটনায় সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে ত্রাণ বিতরণ ও আহতদের দ্রুত উদ্ধার (Medical Evacuation) করার জন্য সামরিক রানওয়ে বা বিমানবন্দর গুরুত্বপূর্ণ মানবিক ভূমিকা পালন করতে পারে। এর মাধ্যমে স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তা ও আস্থাও বৃদ্ধি পায়।

ভূ-রাজনৈতিক তাৎপর্য: দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে বাংলাদেশ অবস্থান করছে। পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সামরিক অবকাঠামোর তুলনায় বাংলাদেশের পার্বত্য সীমান্ত রক্ষা এবং বঙ্গোপসাগরের উত্তর উপকূলে নজরদারি নিশ্চিত করতে পাহাড়ে সামরিক উপস্থিতির সক্ষমতা বাড়ানো সময়ের দাবি। একটি সুসজ্জিত সামরিক বিমানবন্দর বা কৌশলগত এয়ারবেস কেবল আঞ্চলিক প্রতিরক্ষাই জোরদার করবে না; বরং বৈশ্বিক বা আন্তর্জাতিক যেকোনো আগ্রাসনের বিপক্ষে একটি শক্তিশালী ‘ডিটারেন্স’ (প্রতিহত করার ক্ষমতা) হিসেবে কাজ করবে।
বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রূপরেখা ও পরিবেশ সচেতনতা: পাহাড়ে সামরিক বিমানবন্দর নির্মাণ একটি দীর্ঘমেয়াদী ও সূক্ষ্ম পরিকল্পনা। এর জন্য প্রয়োজন, উপযুক্ত স্থান নির্বাচন।
বান্দরবান বা খাগড়াছড়ির সমতল বা তুলনামূলক উপযোগী উপত্যকায় টেকসই রানওয়ে তৈরি করার দুরূহ। তাই কক্সবাজার জেলার (পার্বত্য লামা উপজেলা লাগুয়া) বমুবিলছড়ি ইউনিয়নে ঘাঁটি তৈরি করা সহজ।
অপরদিকে পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনাও ঠিক রাখা যাবে। পাহাড়ি ইকোসিস্টেম বা স্থানীয় বনাঞ্চল ও পাহাড়ের ক্ষতি না করে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এখানে সম্ভব ।
বহুমাত্রিক অবকাঠামো: রানওয়ের পাশাপাশি রাডার স্টেশন, আধুনিক এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম ও দ্রুত টেক-অফ সুবিধা যুক্ত করার মতন পর্যাপ্ত ভূমি রয়েছে।
শেষ কথা: জাতীয় নিরাপত্তা কোনো সাময়িক বিষয় নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদী কৌশলের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। একুশ শতকের আধুনিক যুদ্ধকৌশল এবং সীমান্ত ঝুঁকির ধরণ বদলে গেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে একটি সামরিক বিমানবন্দর স্থাপন কেবল জাতীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার শক্তিমত্তা বাড়াবে না, বরং এটি পুরো পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রাখার ক্ষেত্রে এক নতুন মাইলফলক হয়ে উঠবে।

পার্বত্য অঞ্চলে সামরিক বিমানবন্দর স্থাপনের ক্ষেত্রে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির আইনি ও প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতা: ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (PCJSS)-র মধ্যে ঐতিহাসিক ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিটির প্রধান উদ্দেশ্য ছিল পাবর্ত্য অঞ্চলের (রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান) দীর্ঘদিনের সামরিক অস্থিরতার অবসান ঘটিয়ে রাজনৈতিক সমাধান নিশ্চিত করা এবং পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে শাসন ও ভূমির অধিকার প্রদান করা। পার্বত্য চট্টগ্রামে যেকোনো বৃহৎ অবকাঠামো বা বিমানবন্দর (বিশেষত সামরিক বিমানবন্দর) স্থাপনের উদ্যোগে শান্তি চুক্তির বেশ কিছু ধারা ও বিধান প্রাতিষ্ঠানিক বাধা হিসেবে সামনে আসে।
প্রধান বাধাসমূহ (শান্তি চুক্তির প্রাসঙ্গিক ধারা অনুযায়ী) ক) সামরিক ক্যাম্প ও স্থাপনা গুটিয়ে নেওয়ার বাধ্যবাধকতা (চুক্তির ‘ঘ’ খণ্ড, ১৭ নম্বর ধারা)।
শান্তি চুক্তির ‘ঘ’ খণ্ডের ১৭ নম্বর ধারায় উল্লেখ রয়েছে; সেনাবাহিনী, আনসার ও ভিডিপির স্থায়ী সেনানিবাস (দীঘিনালা, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, কাপ্তাই, বান্দরবান ও রুমা) ব্যতীত সকল অস্থায়ী ক্যাম্প পর্যায়ক্রমে তুলে নেওয়া হবে।
প্রতিবন্ধকতা: নতুন করে সামরিক বিমানবন্দর স্থাপন করতে হলে বিশাল এলাকা জুড়ে নতুন সামরিক অবকাঠামো, প্রশাসনিক ভবন এবং নতুন ইউনিট মোতায়েন প্রয়োজন। যা চুক্তির মূল চেতনা “উন্নয়ন ও বেসামরিকীকরণের স্বার্থে সামরিক উপস্থিতি হ্রাস করা” এর সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
খ) ভূমি অধিগ্রহণ ও ভূমি অধিকার সংক্রান্ত জটিলতা (চুক্তির ‘খ’ খণ্ড, ২৬ নম্বর ধারা)
চুক্তির ধারা: চুক্তির অধীনে গঠিত পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনের ২৬ নম্বর ধারা অনুযায়ী; পার্বত্য জেলা পরিষদের পূর্বানুমতি ছাড়া পার্বত্য তিন জেলায় কোনো জমি হস্তান্তরিত, বিক্রিত, ইজারা দেওয়া বা অধিগ্রহণ করা যাবে না।
প্রতিবন্ধকতা: একটি বিমানবন্দর (বিশেষ করে সামরিক রানওয়ে) তৈরির জন্য বিপুল পরিমাণ সমতল ও পাহাড়ি ভূমির প্রয়োজন। জেলা পরিষদ যদি উক্ত অধিগ্রহণে অনুমোদন না দেয়, তবে আইনিভাবে সরকার বা কেন্দ্রীয় সামরিক কর্তৃপক্ষ সেখানে সরাসরি জমি অধিগ্রহণ করতে পারে না।
গ) পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও জেলা পরিষদের এখতিয়ার
চুক্তির ধারা: শান্তি চুক্তির মাধ্যমে আঞ্চলিক পরিষদ এবং জেলা পরিষদগুলোকে স্থানীয় উন্নয়ন, পরিকল্পনা ও আইন-শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে তদারকির সর্বোচ্চ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবন্ধকতা: সামরিক বা আধা-সামরিক বিমানবন্দর তৈরি করতে গেলে নিরাপত্তা ও পরিবেশগত যে পরিবর্তন আসবে, তাতে আঞ্চলিক পরিষদের সম্মতির প্রয়োজন পড়ে। আঞ্চলিক পরিষদ এটি আঞ্চলিক জনমিতি ও শান্তির ওপর হুমকি মনে করলে সর্বসম্মতিক্রমে বিরোধিতা করতে পারে।
ঘ) জুম্ম জনগোষ্ঠীর উচ্ছেদ ও পুনর্বাসন ঝুঁকি। চুক্তির মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়েছিল যে, পাহাড়িদের প্রথাগত ভূমির অধিকার রক্ষা করা হবে এবং পূর্বে বাস্তুচ্যুত পাহাড়িদের পুনর্বাসন করা হবে।
প্রতিবন্ধকতা: পার্বত্য অঞ্চলে রানওয়ে নির্মাণের উপযুক্ত সমতল জমি বেশ সীমিত। এই জমিগুলো সাধারণত স্থানীয় জুম্ম জনগোষ্ঠীর কৃষিজমি বা বসতভিটা। এখানে সামরিক অবকাঠামো নির্মাণ করলে নতুন করে উচ্ছেদের আশঙ্কা তৈরি হয়, যা চুক্তির পুনর্বাসন নীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার পরিপন্থী।

জাতীয় নিরাপত্তা বনাম শান্তি চুক্তির সমীকরণ:
যদিও সংবিধান ও জাতীয় প্রতিরক্ষা নীতি অনুযায়ী বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও সীমান্ত নিরাপত্তার (বিশেষ করে মিয়ানমার ও ভারত সীমান্ত সংলগ্ন কৌশলগত গুরুত্বের কারণে) প্রয়োজনে সরকার দেশের যেকোনো স্থানে সামরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার অধিকার রাখে। তবে পার্বত্য অঞ্চলে এই পদক্ষেপ গ্রহণ করতে গেলে শান্তি চুক্তির আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের আইনি কাঠামো এবং রাজনৈতিক ঐকমত্য বজায় রাখার বিষয়টি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেয়।
এই বাস্তবতায় পার্বত্য চট্টগ্রামে সামরিক বিমানবন্দর স্থাপনের ক্ষেত্রে প্রধান বাধাগুলো সামরিক নীতিগত নয়, বরং আইনি, রাজনৈতিক এবং ভূমি অধিকার সংক্রান্ত।
সুতরাং কক্সবাজার জেলাধীন চকরিয়া উপজেলার বমুবিলছড়ি ইউনিয়নে যদি বিমানবন্দর করা হয়, তবে চুক্তি লঙ্ঘন না করেও সামরিক ও প্রশাসনিক চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হতে পারে। বিষয় সরকার ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট উচ্চ মহল সুবিবেচনায় নেয়া দরকার।
মুহাম্মদ কামরুজ্জামান সিনিয়র সাংবাদিক, সাধারণ সম্পাদক লামা প্রেসক্লাব, প্রকাশক-সম্পাদক বান্দরবান ট্রিবিউন। ১১ সেপ্টেম্বর/২০২৬
ট্রিবিউন ডেস্ক: 



















