
জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কর্মরত সাংবাদিকদের পদবি আছে , গ্রেড নেই, বেতন কাঠামোয় স্বীকৃতি নেই; তাহলে তাঁদের পেশাগত ও অর্থনৈতিক অধিকার কোথায়?
বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কর্মরত সাংবাদিকরা বছরের পর বছর মাঠে থেকে সংবাদ সংগ্রহ করেন। দুর্গম এলাকায় ছুটে যান, ঝুঁকি নেন, রাত-বিরাতে ঘটনাস্থলে পৌঁছান, মানুষের কথা তুলে ধরেন। অথচ সরকারি স্বীকৃত বেতন কাঠামোয় তাঁদের অবস্থান কোথায়; এই প্রশ্নটি এখন জোরালোভাবে তোলা জরুরি।

বাংলাদেশ গেজেট, অতিরিক্ত, ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৯-এ প্রকাশিত ৯ম সংবাদপত্র মজুরি বোর্ডের প্রজ্ঞাপন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সংবাদপত্র ও সংবাদ সংস্থায় কর্মরত সাংবাদিকদের বিভিন্ন পদবি ও পদমর্যাদা নির্ধারণ করে গ্রেডভুক্ত করা হয়েছে।
সংবাদপত্রে বিশেষ গ্রেড: সম্পাদক।
গ্রেড-১: নির্বাহী সম্পাদক, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, যুগ্ম-সম্পাদক, উপ-সম্পাদক, সহযোগী সম্পাদক, বার্তা-সম্পাদক, সহকারী সম্পাদক, চিফ এডিটর, বিশেষ সংবাদদাতা ও নগর সম্পাদক।
গ্রেড-২: যুগ্ম-বার্তা সম্পাদক, প্রধান প্রতিবেদক, প্রধান সহ-সম্পাদক, সিনিয়র সহ-সম্পাদক, সিনিয়র প্রতিবেদক, শিফট-ইনচার্জ, মফস্বল সম্পাদক, ক্রীড়া সম্পাদক, বাণিজ্যিক সম্পাদক, বিনোদন সম্পাদক, প্রধান আলোচিত্র সাংবাদিক, সিনিয়র আলোচিত্র সাংবাদিক, সম্পাদকীয় সহকারী, প্রধান সম্পাদনা সহকারী, ব্যুরো প্রধান, সিনিয়র সংবাদদাতা, সিনিয়র কার্টুনিস্ট, সিনিয়র আর্টিস্ট ও ফোকাল/প্রধান সংবাদ প্রযোজকসহ সংশ্লিষ্ট পদ।
গ্রেড-৩: সহ-সম্পাদক, নিজস্ব প্রতিবেদক, আলোচিত্র সাংবাদিক, ক্রীড়া প্রতিবেদক, নিজস্ব সংবাদদাতা, আর্টিস্ট, কার্টুনিস্ট, সিনিয়র সম্পাদনা সহকারী ও সংবাদ প্রগ্রামার।
গ্রেড-৪: শিক্ষানবিশ সহ-সম্পাদক, শিক্ষানবিশ নিজস্ব প্রতিবেদক, শিক্ষানবিশ নিজস্ব সংবাদদাতা ও সম্পাদনা সহকারী।
গ্রেড-৫: শিক্ষানবিশ সম্পাদনা সহকারী।
একইভাবে সংবাদ সংস্থায় কর্মরত সাংবাদিকদের জন্যও রয়েছে বিভিন্ন পদ ও গ্রেডের কাঠামো। সেখানে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক থেকে শুরু করে প্রধান প্রতিবেদক, সিনিয়র নিজস্ব প্রতিবেদক, ব্যুরো প্রধান, নিজস্ব প্রতিবেদক ও নিজস্ব সংবাদদাতা পর্যন্ত বিভিন্ন পদ নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কর্মরত সাংবাদিকরা কোথায়?
তাঁদের জন্য নির্দিষ্ট পদবি কোথায়? বেতন কাঠামো কোথায়? চাকরির নিশ্চয়তা কোথায়? শ্রমের মূল্য কোথায়? আরও বড় প্রশ্ন—একজন জেলা বা উপজেলা সাংবাদিক কি সাংবাদিক নন?
যদি তিনি সাংবাদিকই হন, তাহলে তাঁর শ্রমের বিনিময়ে ন্যায্য বেতন-ভাতা থাকবে না কেন? যদি সংবাদমাধ্যমের একজন সহকর্মী হিসেবে তাঁকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, তাহলে তাঁর চাকরির কাঠামো ও আর্থিক অধিকার নিশ্চিত করা হবে না কেন? বাস্তবতা আরও নির্মম। অধিকাংশ জেলা-উপজেলা পর্যায়ের সাংবাদিক নিয়মিত বেতন-ভাতা পান না।

অনেক ক্ষেত্রে সংবাদ সংগ্রহ, যাতায়াত, মোবাইল, ইন্টারনেট ও অন্যান্য খরচও তাঁদের নিজেদের বহন করতে হয়। আবার অনেক সংবাদমাধ্যম বিজ্ঞাপনের কমিশন বা অন্যান্য প্রাপ্য সুবিধা দিতেও অনীহা দেখায়। তাহলে একজন মফস্বল সাংবাদিক চলবেন কীভাবে? তাঁর কি পরিবার নেই? সন্তান নেই? ঘর-সংসার নেই? জীবনযাপনের প্রয়োজন নেই? বেতন দেবেন না, চাকরির নিরাপত্তা দেবেন না, বিজ্ঞাপনের ন্যায্য কমিশনও দেবেন না।
তারপর কোনো সাংবাদিক যদি অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন, তখন পুরো সাংবাদিক সমাজকে ‘চাঁদাবাজ’ বলে গালি দেওয়ার নৈতিক অধিকার কার আছে? বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত; মফস্বল সাংবাদিকদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করার এই কাঠামো কি অনৈতিকতার পথকে উন্মুক্ত করে দিচ্ছে না?
তথ্য মন্ত্রণালয়, সংবাদমাধ্যমের মালিক, সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ; সবার কাছেই তাই স্পষ্ট প্রশ্ন:
জেলা-উপজেলায় যারা আপনাদের সংবাদমাধ্যমের জন্য প্রতিদিন সংবাদ সংগ্রহ করছেন, তাঁরা কি আপনাদের সহকর্মী নন?
তাঁরা যদি সহকর্মী হন, তাঁদের বেতন-ভাতা ও পেশাগত মর্যাদার কাঠামো থাকবে না কেন?
আর যদি তাঁরা সহকর্মী না হন, তাহলে তাঁদের মাধ্যমে নিয়মিত সংবাদ সংগ্রহ করা হবে কেন?

সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, জেলা-উপজেলা পর্যায়ে কর্মরত সাংবাদিকদের এই দীর্ঘদিনের বঞ্চনা নিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই সাংবাদিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকেও দৃশ্যমান ও জোরালো প্রতিবাদ দেখা যায় না। রাজধানীকেন্দ্রিক সাংবাদিক সংগঠনগুলোর কাছ থেকেও মফস্বলের সাংবাদিকদের অধিকার নিয়ে আরও শক্ত অবস্থান প্রত্যাশিত।
মফস্বলের সাংবাদিকরা কারও দয়া চান না। তাঁরা তাঁদের শ্রমের ন্যায্য মূল্য, পেশাগত মর্যাদা ও অধিকার চান।
সরকার যদি সাংবাদিকদের পদবি ও গ্রেড নির্ধারণ করতে পারে, তাহলে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কর্মরত সাংবাদিকদের জন্যও সুস্পষ্ট পদবি, বেতন-ভাতা, বিজ্ঞাপন কমিশন, চাকরির নিরাপত্তা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার কার্যকর কাঠামো তৈরি করতে হবে। কারণ মফস্বল সাংবাদিকতা কোনো দান-খয়রাত নয়, এটি সংবাদমাধ্যমের অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
রাজধানীর নিউজরুমে বসে যে সংবাদ প্রকাশিত হয়, তার বড় একটি অংশের শুরু হয় জেলা-উপজেলার কোনো মাঠকর্মীর ফোনকল, ছবি, ভিডিও কিংবা প্রতিবেদনের মাধ্যমে। তাই মফস্বলের সাংবাদিকদের অধিকার নিশ্চিত না করে সাংবাদিকতার মর্যাদা রক্ষার কথা বলা নিছক ভণ্ডামি।
জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সাংবাদিকদের স্বীকৃতি, বেতন-ভাতা ও পেশাগত অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। চাঁদাবাজির অভিযোগ দিয়ে মফস্বল সাংবাদিকদের অপমান নয়—ন্যায্য অধিকার দিয়ে তাঁদের মর্যাদা দিতে হবে। সকল সাংবাদিক ও সংবাদকর্মীর জ্ঞাতার্থে ৯ম সংবাদপত্র মজুরি বোর্ডের প্রজ্ঞাপনটি সংরক্ষণ ও শেয়ার করার অনুরোধ রইল।
বিশেষ করে যারা নিজ নিজ পদমর্যাদা, গ্রেড ও চাকরিসংক্রান্ত অধিকার সম্পর্কে জানতে চান, তাঁদের জন্য এই সরকারি প্রজ্ঞাপনটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে কাজে লাগতে পারে। নিজের অধিকার নিজে জানুন। অন্য সাংবাদিককেও জানতে সহায়তা করুন।
মফস্বলের সাংবাদিকের শ্রমের মূল্য চাই, মর্যাদা চাই, অধিকার চাই।
সুফল চাকমা-বান্দরবান
তারিখঃ ২৫আগষ্ট”২৬
সুফল চাকমা 




















