Lama ০২:০০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সাংবাদিকতাকে ভুয়া পরিচয় ও অপসংস্কৃতি থেকে মুক্ত রাখার আহ্বান

সাংবাদিকতা শুধু পেশা নয়, এটি জাতির প্রতি অঙ্গীকার : খায়রুল আলম সুমন

সাংবাদিকের হাতে থাকা কলম শুধু লেখার একটি উপকরণ নয়, এটি সত্য, ন্যায় ও মানবতার পক্ষে কথা বলার সবচেয়ে মূল্যবান অস্ত্র। এই কলমের মাধ্যমে জাতির সামনে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ তুলে ধরা, অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া এবং মানুষের সুখ-দুঃখ, সমস্যা-সম্ভাবনা ও বাস্তব চিত্র তুলে ধরা একজন প্রকৃত সাংবাদিকের প্রধান দায়িত্ব। সাংবাদিকতা কোনো পুতুল খেলা নয়, এটি একটি মহান দায়িত্ব ও জনসেবামূলক পেশা।

একজন সাংবাদিক যদি সততা, নিষ্ঠা ও সাহসিকতার সঙ্গে দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজ করেন, তাহলে তিনি শুধু পেশাগত দায়িত্বই পালন করেন না, বরং মানবতারও সেবা করেন। ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী, মহান আল্লাহ সর্বপ্রথম কলম সৃষ্টি করেছেন। তাই সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে কলম পরিচালনা করা সেই পবিত্র সৃষ্টির মর্যাদা রক্ষা করারই নামান্তর।

সাংবাদিক শুধু একজন ব্যক্তি নন, তিনি দেশ, জাতি ও সমাজের বিবেক। একজন প্রকৃত সাংবাদিকের অবদান জাতি আজীবন স্মরণ রাখে। সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করলে মানুষ যেমন সম্মান দেয়, তেমনি সৃষ্টিকর্তার কাছেও এর প্রতিদান রয়েছে। ক্ষমতা, সম্মান ও মর্যাদা সবই মহান আল্লাহর দান। তিনি যেমন মানুষকে সম্মানিত করেন, তেমনি মুহূর্তেই সেই সম্মান ফিরিয়ে নেওয়ার ক্ষমতাও রাখেন। তাই প্রতিটি সাংবাদিকের উচিত বিনয়, সততা ও ন্যায়বোধ নিয়ে দায়িত্ব পালন করা।

একসময় সংবাদ সংগ্রহ ও প্রেরণের জন্য আধুনিক প্রযুক্তি ছিল না। তখন ডাকযোগে জাতীয় পত্রিকায় সংবাদ পাঠাতে হতো। সেই কঠিন সময়েও দেশের প্রবীণ সাংবাদিকরা নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। আজ প্রযুক্তির অগ্রগতিতে সাংবাদিকতা অনেক সহজ হয়েছে, কিন্তু প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক না কেন, প্রবীণ সাংবাদিকদের অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞার কোনো বিকল্প নেই।

নবীন সাংবাদিকদের উচিত প্রবীণদের কাছ থেকে শেখা, তাদের অভিজ্ঞতাকে সম্মান করা এবং তাদের পথচলা থেকে শিক্ষা নেওয়া। দুর্ভাগ্যজনকভাবে অনেক নবীনই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত ভাবতে শুরু করেন, অথচ শেখার কোনো শেষ নেই। মনে রাখতে হবে, সাংবাদিকতার প্রকৃত ভিত্তি গড়ে ওঠে অভিজ্ঞতা, সততা ও দায়িত্ববোধের ওপর।

বর্তমান সময়ে সাংবাদিকতার চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। আগে একজন ফটোসাংবাদিক হতে হলে প্রশিক্ষণ, দক্ষতা এবং পেশাগত নীতিমালা মেনে চলতে হতো। এখন অনেক ক্ষেত্রে সেই মানদণ্ড উপেক্ষিত হচ্ছে। বিভিন্ন স্থানে দেখা যায়, যোগ্যতা, নৈতিকতা কিংবা সাংবাদিকতার মৌলিক জ্ঞান ছাড়াই অনেকেই শুধু পরিচয়পত্র বা মোটরসাইকেলে “প্রেস” স্টিকার লাগিয়ে নিজেকে সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, কিছু গণমাধ্যমে সাংবাদিক নিয়োগের ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই করা হয় না। শিক্ষাগত যোগ্যতা, নৈতিক মানদণ্ড কিংবা আইনগত বিষয় বিবেচনা না করেই অনেককে দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। ফলে প্রকৃত সাংবাদিকদের পাশাপাশি ভুয়া সাংবাদিকের সংখ্যাও বেড়ে যাচ্ছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পুরো সাংবাদিক সমাজের ওপর। অনেক সময় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডেও ভুয়া সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করা হচ্ছে, যা এই মহান পেশার মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করছে।

সাংবাদিকতা কখনো ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তার, ক্ষমতার অপব্যবহার বা পরিচয়ের অপপ্রয়োগের মাধ্যম হতে পারে না। এটি সত্য ও ন্যায়ের পথে চলার এক মহান অঙ্গীকার। তাই সাংবাদিকদের উচিত ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দেশ, জনগণ ও মানবতার কল্যাণে কাজ করা।

আসুন, আমরা সবাই মিলে সাংবাদিকতার মর্যাদা রক্ষা করি। সত্য, সততা, ন্যায় ও দায়িত্ববোধকে ধারণ করে এই মহান পেশাকে আরও সম্মানিত করি। প্রবীণদের সম্মান করি, নবীনদের সঠিক পথে এগিয়ে যেতে সহায়তা করি এবং সাংবাদিকতাকে ভুয়া পরিচয় ও অপসংস্কৃতি থেকে মুক্ত রাখি।

গর্বের সঙ্গে বলতে চাই…
আমি একজন সাংবাদিক।
আমি একজন প্রকৃত কলম সৈনিক।

লেখক : প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, সিলেট বিভাগীয় প্রেসক্লাব।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

Popular Post

বাঘাইছড়ি এ্যাডমিনিস্টেশন স্কুল এন্ড কলেজে বিজ্ঞান ল্যাব উদ্বোধন

Bandarban Tribune

সাংবাদিকতাকে ভুয়া পরিচয় ও অপসংস্কৃতি থেকে মুক্ত রাখার আহ্বান

সাংবাদিকতা শুধু পেশা নয়, এটি জাতির প্রতি অঙ্গীকার : খায়রুল আলম সুমন

Update Time : ০৬:৩৭:৩১ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬

সাংবাদিকের হাতে থাকা কলম শুধু লেখার একটি উপকরণ নয়, এটি সত্য, ন্যায় ও মানবতার পক্ষে কথা বলার সবচেয়ে মূল্যবান অস্ত্র। এই কলমের মাধ্যমে জাতির সামনে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ তুলে ধরা, অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া এবং মানুষের সুখ-দুঃখ, সমস্যা-সম্ভাবনা ও বাস্তব চিত্র তুলে ধরা একজন প্রকৃত সাংবাদিকের প্রধান দায়িত্ব। সাংবাদিকতা কোনো পুতুল খেলা নয়, এটি একটি মহান দায়িত্ব ও জনসেবামূলক পেশা।

একজন সাংবাদিক যদি সততা, নিষ্ঠা ও সাহসিকতার সঙ্গে দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজ করেন, তাহলে তিনি শুধু পেশাগত দায়িত্বই পালন করেন না, বরং মানবতারও সেবা করেন। ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী, মহান আল্লাহ সর্বপ্রথম কলম সৃষ্টি করেছেন। তাই সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে কলম পরিচালনা করা সেই পবিত্র সৃষ্টির মর্যাদা রক্ষা করারই নামান্তর।

সাংবাদিক শুধু একজন ব্যক্তি নন, তিনি দেশ, জাতি ও সমাজের বিবেক। একজন প্রকৃত সাংবাদিকের অবদান জাতি আজীবন স্মরণ রাখে। সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করলে মানুষ যেমন সম্মান দেয়, তেমনি সৃষ্টিকর্তার কাছেও এর প্রতিদান রয়েছে। ক্ষমতা, সম্মান ও মর্যাদা সবই মহান আল্লাহর দান। তিনি যেমন মানুষকে সম্মানিত করেন, তেমনি মুহূর্তেই সেই সম্মান ফিরিয়ে নেওয়ার ক্ষমতাও রাখেন। তাই প্রতিটি সাংবাদিকের উচিত বিনয়, সততা ও ন্যায়বোধ নিয়ে দায়িত্ব পালন করা।

একসময় সংবাদ সংগ্রহ ও প্রেরণের জন্য আধুনিক প্রযুক্তি ছিল না। তখন ডাকযোগে জাতীয় পত্রিকায় সংবাদ পাঠাতে হতো। সেই কঠিন সময়েও দেশের প্রবীণ সাংবাদিকরা নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। আজ প্রযুক্তির অগ্রগতিতে সাংবাদিকতা অনেক সহজ হয়েছে, কিন্তু প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক না কেন, প্রবীণ সাংবাদিকদের অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞার কোনো বিকল্প নেই।

নবীন সাংবাদিকদের উচিত প্রবীণদের কাছ থেকে শেখা, তাদের অভিজ্ঞতাকে সম্মান করা এবং তাদের পথচলা থেকে শিক্ষা নেওয়া। দুর্ভাগ্যজনকভাবে অনেক নবীনই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত ভাবতে শুরু করেন, অথচ শেখার কোনো শেষ নেই। মনে রাখতে হবে, সাংবাদিকতার প্রকৃত ভিত্তি গড়ে ওঠে অভিজ্ঞতা, সততা ও দায়িত্ববোধের ওপর।

বর্তমান সময়ে সাংবাদিকতার চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। আগে একজন ফটোসাংবাদিক হতে হলে প্রশিক্ষণ, দক্ষতা এবং পেশাগত নীতিমালা মেনে চলতে হতো। এখন অনেক ক্ষেত্রে সেই মানদণ্ড উপেক্ষিত হচ্ছে। বিভিন্ন স্থানে দেখা যায়, যোগ্যতা, নৈতিকতা কিংবা সাংবাদিকতার মৌলিক জ্ঞান ছাড়াই অনেকেই শুধু পরিচয়পত্র বা মোটরসাইকেলে “প্রেস” স্টিকার লাগিয়ে নিজেকে সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, কিছু গণমাধ্যমে সাংবাদিক নিয়োগের ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই করা হয় না। শিক্ষাগত যোগ্যতা, নৈতিক মানদণ্ড কিংবা আইনগত বিষয় বিবেচনা না করেই অনেককে দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। ফলে প্রকৃত সাংবাদিকদের পাশাপাশি ভুয়া সাংবাদিকের সংখ্যাও বেড়ে যাচ্ছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পুরো সাংবাদিক সমাজের ওপর। অনেক সময় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডেও ভুয়া সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করা হচ্ছে, যা এই মহান পেশার মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করছে।

সাংবাদিকতা কখনো ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তার, ক্ষমতার অপব্যবহার বা পরিচয়ের অপপ্রয়োগের মাধ্যম হতে পারে না। এটি সত্য ও ন্যায়ের পথে চলার এক মহান অঙ্গীকার। তাই সাংবাদিকদের উচিত ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দেশ, জনগণ ও মানবতার কল্যাণে কাজ করা।

আসুন, আমরা সবাই মিলে সাংবাদিকতার মর্যাদা রক্ষা করি। সত্য, সততা, ন্যায় ও দায়িত্ববোধকে ধারণ করে এই মহান পেশাকে আরও সম্মানিত করি। প্রবীণদের সম্মান করি, নবীনদের সঠিক পথে এগিয়ে যেতে সহায়তা করি এবং সাংবাদিকতাকে ভুয়া পরিচয় ও অপসংস্কৃতি থেকে মুক্ত রাখি।

গর্বের সঙ্গে বলতে চাই…
আমি একজন সাংবাদিক।
আমি একজন প্রকৃত কলম সৈনিক।

লেখক : প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, সিলেট বিভাগীয় প্রেসক্লাব।