
চারদিকে পাহাড় আর সবুজ অরণ্য। দুর্গম পাহাড়ি পথ, দীর্ঘ যাত্রা আর যোগাযোগের নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে যেতে হয় এই জনপদে। কাপ্তাই জেটিঘাট থেকে প্রায় দুই ঘণ্টা নৌপথ পেরিয়ে আরও প্রায় দুই ঘণ্টা পাহাড়ি পথ হেঁটে পৌঁছাতে হয় এখানে। কাপ্তাই, বিলাইছড়ি ও রাজস্থলী; তিন উপজেলার সীমান্তবর্তী এই দুর্গম এলাকায় একসময় শিক্ষার সুযোগ ছিল প্রায় শূন্যের কোঠায়।
সংবাদদাতা নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি

স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও ১৩০ নম্বর বারুদগোলা মৌজায় ছিল না কোনো সরকারি বা বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিদ্যুতের আলোও পৌঁছেনি এই জনপদে। দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা, দারিদ্র্য, বিদ্যালয়ের অভাব এবং শিক্ষা সম্পর্কে পর্যাপ্ত সামাজিক সচেতনতা না থাকায় বহু শিশু প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ থেকেই বঞ্চিত হয়ে আসছিল।
এলাকাটি মূলত দরিদ্র জুমচাষিনির্ভর। অধিকাংশ পরিবারই আর্থিকভাবে অসচ্ছল। পাশাপাশি দীর্ঘদিনের দুর্গম জীবনযাপন এবং নিরক্ষরতা ও অসচেতনতার কারণে সন্তানদের শিক্ষার বিষয়ে এখনো আশানুরূপ সামাজিক সচেতনতা গড়ে ওঠেনি। ফলে আশপাশের অন্তত পাঁচটি পাড়ার অসংখ্য শিশু প্রাথমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছিলো।

এই বাস্তবতায় শিক্ষাবঞ্চিত শিশুদের জন্য ২০২৩ সালে স্থানীয় ও কয়েকজন শুভাকাঙ্ক্ষীর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা করা হয় শুভধন পাড়া সংঘরাজ শীলালংকার মহাথের বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি। প্রতিষ্ঠার পর থেকে নানা প্রতিকুলতার মাঝেও দুর্গম এই জনপদে বিদ্যালয়টি শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে প্রায় ৭০ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। তবে আশপাশের পাঁচটি পাড়ার সব শিশুকে বিদ্যালয়ের আওতায় আনা সম্ভব হলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা শতাধিক ছাড়িয়ে যাবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
‘শিক্ষার সুযোগ থেকে যেন কোনো শিশু বঞ্চিত না হয়’
বিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠার প্রধান উদ্যোক্তা ও সার্বিক সহযোগিতায় ছিলেন ভদন্ত বুদ্ধজ্যোতি ভিক্ষু (ভাগ্যজিৎ তঞ্চঙ্গ্যা)। তাঁর উদ্যোগ ও প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে বিদ্যালয়টির কার্যক্রম এগিয়ে যাচ্ছে।
ভদন্ত বুদ্ধজ্যোতি ভিক্ষু বলেন, “এই এলাকার শিশুরা যেন শুধু দুর্গমতার কারণে শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয় সেই চিন্তা থেকেই বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। অনেক কষ্ট করে শিশুরা এখানে পড়তে আসে। আমাদের ইচ্ছা, এই বিদ্যালয়কে আরও ভালোভাবে গড়ে তুলে এলাকার প্রতিটি শিশুকে শিক্ষার আওতায় আনা।”

তিনি বলেন, বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার আগে এই বিস্তীর্ণ এলাকায় কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল না। দুর্গমতার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের শিক্ষা সম্পর্কে সচেতনতার অভাব,দারিদ্রতাও শিশুদের বিদ্যালয়ের বাইরে থাকার অন্যতম কারণ ছিল। বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার পর ধীরে ধীরে অভিভাবকদের মধ্যেও শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ছে।”
বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনায় কানাডায় অবস্থানরত প্রজ্ঞাশ্রী ভিক্ষু, শ্রীলঙ্কায় অবস্থানরত বিপসসি ভান্তে, কলেজ শিক্ষক অমর বিকাশসহ কয়েকজন শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছেন।
পাঁচ পাড়ার অসংখ্য শিশু এখনো বিদ্যালয়ের বাইরে
স্থানীয়রা জানান, বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার আগে আশপাশের পাঁচটি পাড়ার শিশুদের জন্য কাছাকাছি কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল না। দূরের বিদ্যালয়ে যেতে হলে দুর্গম পাহাড়ি তিন চার ঘন্টা পথ পাড়ি দিতে হতো। দরিদ্র পরিবারের পক্ষে প্রতিদিন সন্তানদের এত দূরে পাঠানোও সম্ভব ছিল না। ফলে অনেক শিশুর শিক্ষাজীবন শুরু হওয়ার আগেই থেমে যেত।

একজন স্থানীয় অভিভাবক বলেন, আগে এখান থেকে দূরের বিদ্যালয়ে সন্তানদের পাঠানো খুবই কঠিন ছিল। পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে প্রতিদিন যাওয়া-আসা করা সম্ভব হতো না। এখন পাড়ার কাছেই স্কুল হওয়ায় ছেলে-মেয়েরা নিয়মিত পড়াশোনা করতে পারছে।”
স্থানীয়দের মতে, বর্তমানে বিদ্যালয়ে প্রায় ৭০ জন শিক্ষার্থী পড়লেও এলাকার সব শিশুকে বিদ্যালয়ের আওতায় আনা গেলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা শতাধিক হবে। এ জন্য বিদ্যালয়ের পরিসর বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি।
‘বিনা বেতনেই পড়াচ্ছেন শিক্ষকরা’
বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক বলেন, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কোনো বেতন নেওয়া হয় না। আমরা সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে স্বেচ্ছাশ্রমে পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু দীর্ঘদিন এভাবে চালানো কঠিন। বিদ্যালয়ের স্থায়ী ব্যবস্থা ও সরকারি সহযোগিতা প্রয়োজন।”
বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও শিশুদের পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁদের এই স্বেচ্ছাশ্রমের ফলে দুর্গম এলাকার দরিদ্র পরিবারের শিশুরা অন্তত প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে।
অবকাঠামো সংকট, নেই বিদ্যুতের সুবিধা
বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, শিক্ষা উপকরণ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি রয়েছে। দুর্গম এলাকায় এখনো বিদ্যুতের আলো পৌঁছেনি। ফলে শিক্ষার পরিবেশ নানা সীমাবদ্ধতার মুখে পড়ছে।
তবে এসব প্রতিকূলতার মধ্যেও বই-খাতা হাতে প্রতিদিন বিদ্যালয়ে ছুটে আসে শিশুরা। পাহাড়ের দুর্গম পথ পেরিয়ে বিদ্যালয়ে আসা এসব শিশুর চোখে এখন ভবিষ্যৎ বদলের স্বপ্ন।
জাতীয়করণের দাবি
স্থানীয়দের দাবি, বিদ্যালয়টি দ্রুত জাতীয়করণের আওতায় আনা হলে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষক ও পুরো এলাকার মানুষ উপকৃত হবে। বর্তমানে বিনা বেতনে বা স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করা শিক্ষকরা প্রশিক্ষণ, পেশাগত দক্ষতা উন্নয়ন, আর্থিক নিরাপত্তা ও পেশাগত স্থায়িত্বের সুযোগ পাবেন।
একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, সরকার যদি বিদ্যালয়টি জাতীয়করণ করে, তাহলে শুধু এই ৭০টি শিশু নয়, আশপাশের আরও শতাধিক শিশু শিক্ষার সুযোগ পাবে। পাশাপাশি শিক্ষক ও বিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎও নিশ্চিত হবে।”
‘সরকারি সহযোগিতা পেলে আরও অনেক দূর এগোবে’
বিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি স্বীকৃতি ও সহযোগিতা পেলে বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন, পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ এবং শিক্ষার্থীদের জন্য আরও উন্নত শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব হবে। এতে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার কমবে এবং দুর্গম পাহাড়ি জনপদের আরও বেশি শিশু শিক্ষার আওতায় আসবে।

ভদন্ত বুদ্ধজ্যোতি ভিক্ষু বলেন, “আমরা চাই বিদ্যালয়টি সরকারি স্বীকৃতি পাক এবং জাতীয়করণের আওতায় আসুক। এতে শিক্ষকরা প্রশিক্ষণ ও পেশাগত দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাবেন, তাঁদের আর্থিক নিরাপত্তা তৈরি হবে। সবচেয়ে বড় কথা, দুর্গম এলাকার দরিদ্র পরিবারের শিশুদের জন্য শিক্ষার একটি স্থায়ী ব্যবস্থা গড়ে উঠবে।”
তিনি আরও বলেন, এখনো আশপাশের অনেক শিশু বিদ্যালয়ের বাইরে রয়েছে। তাদেরও বিদ্যালয়ে নিয়ে আসতে হলে শুধু স্থানীয় উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; সরকারি সহযোগিতা দরকার। সরকার এগিয়ে এলে এই বিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে পুরো এলাকার শিক্ষাব্যবস্থায় একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।”
পাহাড়ের দুর্গম পথ, বিদ্যুতের অভাব, দারিদ্র্য ও নানা সামাজিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও শুভধন পাড়া সংঘরাজ শীলালংকার মহাথের বিদ্যালয় এখন এই জনপদের মানুষের কাছে আশার প্রতীক। যে এলাকায় স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল না, সেখানে আজ প্রায় ৭০ শিশু বই-খাতা হাতে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছে।
তবে এই অগ্রযাত্রা এখনো পূর্ণতা পায়নি। আশপাশের পাঁচটি পাড়ায় থাকা অসংখ্য শিশু এখনো শিক্ষার বাইরে। তাদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে হলে বিদ্যালয়টির স্থায়ী অবকাঠামো, শিক্ষক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দুর্গম পাহাড়ি এই জনপদের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে বিদ্যালয়টির প্রতি বিশেষ নজর দেবেন এবং দ্রুত জাতীয়করণের উদ্যোগ নেবেন। এতে শুধু একটি বিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎই নিশ্চিত হবে না—শিক্ষার আলো পৌঁছাবে পাহাড়ের আরও বহু ঘরে, বদলে যাবে শত শত শিশুর ভবিষ্যৎ।
সুমন খান, রাজস্থলী সংবাদদাতা: 




















