
বান্দরবানের আলীকদমে পারিবারিক কলহের জেরে প্যারাকোয়াট বিষপানে আরাফাত মিয়া (২৮) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) দুপুরে উপজেলার ১নং আলীকদম ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের পেঠান সর্দার পাড়ায় নিজ বসতঘরে বিষপান করেন তিনি। পরে স্থানীয়দের সহযোগিতায় তাকে আলীকদম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) রাত ১টার দিকে তার মৃত্যু হয়।
নিহত আরাফাত মিয়া পেঠান সর্দার পাড়ার বাসিন্দা আব্দুল আজিজের ছেলে। পরিবারের সদস্যদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পারিবারিক বিরোধের জের ধরে তিনি বিষপান করেন। আরাফাতের দুই স্ত্রী রয়েছে বলেও জানিয়েছেন স্বজনরা। তবে পারিবারিক বিরোধের সুনির্দিষ্ট কারণ তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার দুপুরে নিজ বাড়িতে বিষপানের পর আরাফাত পানবাজার এলাকায় চলে আসেন। সেখানে তিনি ইউসুফ আলীর হোটেলে গিয়ে স্বাভাবিকভাবে ভাত খান। ভাত খেয়ে হোটেল থেকে বের হওয়ার পর পানবাজার-কলারঝিরি মোড়ের একটি ছাউনির নিচে দাঁড়িয়ে থাকেন।
এ সময় স্থানীয় কয়েকজন তার আচরণ ও শারীরিক অবস্থায় অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করেন। তারা তাকে বিষয়টি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে আরাফাত বমি বমি ভাবের কথা জানান। পরে স্থানীয়রা তাকে লেবু খাওয়ান। কিছুক্ষণ পর তিনি বমি করলে বিষপানের বিষয়টি স্থানীয়দের কাছে স্পষ্ট হয় বলে স্বজনরা জানান। এরপর স্থানীয়রা দ্রুত তার স্বজনদের খবর দেন।
নিহতের ভাগিনা মো. তারেক বলেন, স্থানীয়রা তাকে অস্বাভাবিক অবস্থায় দেখতে পেয়ে আমাদের খবর দেন। খবর পাওয়ার পর আমরা দ্রুত তাকে আলীকদম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাই। সেখানে চিকিৎসক তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর চট্টগ্রাম মেডিকেলে রেফার করেন।
তিনি আরও বলেন, চট্টগ্রামে নেওয়ার সময় তাকে মালুমঘাট মেমোরিয়াল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখান থেকে আবারও উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেলে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। পরে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত ১টার দিকে তার মৃত্যু হয়।
তবে পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আরাফাত মঙ্গলবার দুপুর ১টার দিকে পেঠান সর্দার পাড়ায় নিজ বসতঘরে বিষপান করেন। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে আলীকদম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। চিকিৎসক প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করেন।
পুলিশের নথিতে আরও বলা হয়েছে, মঙ্গলবার রাত ১০টার দিকে আরাফাতকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে ১৬ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বুধবার রাত ১টার দিকে তার মৃত্যু হয়। চিকিৎসকের নথিতে মৃত্যুর কারণ হিসেবে “PARAQUAT POISONING” উল্লেখ করা হয়েছে।
আলীকদম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. শফিউল আলম বলেন, রোগীর শরীরে প্যারাকোয়াট বিষের প্রতিক্রিয়া বেশি ছিল। এ কারণে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়।
তিনি বলেন, প্যারাকোয়াট ঘাস মারার জন্য ব্যবহৃত এক ধরনের বিষ। এ ধরনের বিষ পান করা রোগীর ক্ষেত্রে ওয়াশ করার সময় বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। কেরোসিন কিংবা পেট্রোলজাতীয় পদার্থের মতো এ ধরনের বিষ ওয়াশ করলে ক্ষতির আশঙ্কা বাড়তে পারে। এ কারণে আমরা প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেলে রেফার করি।
চিকিৎসকের এই বক্তব্যের সঙ্গে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসা-নথিতেও মৃত্যুর কারণ হিসেবে PARAQUAT POISONING উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ আরাফাতের বিষপানের বিষয়টি চিকিৎসা-নথিতে প্যারাকোয়াট বিষক্রিয়া হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে, বিষপানের পর আরাফাত পানবাজারে গিয়ে স্বাভাবিকভাবে ভাত খাওয়া এবং পরে কলারঝিরি মোড়ে অবস্থান করার বিষয়টি স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনার সৃষ্টি করেছে। বিষপানের পরও তিনি কীভাবে পানবাজারে পৌঁছান এবং সেখানে স্বাভাবিকভাবে খাবার গ্রহণ করেন, সে বিষয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি। স্থানীয়দের দ্রুত তৎপরতায় তাকে হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয় বলে স্বজনরা জানান।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে আরাফাতের মরদেহ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ পাওয়া গেলে এ ঘটনায় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আরাফাতের মৃত্যুর ঘটনায় পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। পারিবারিক কলহের প্রকৃত কারণ এবং ঘটনার বিষয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ করা হবে কি না, তা এখনও জানা যায়নি।
নিজস্ব সংবাদদাতা, আলীকদম: 



















