
লামা বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা, সদর রেঞ্জ কর্মকর্তাসহ অপর এক ব্যবসায়ী ও একজন রিক্সা চালকের নামে মামলা দিয়ে মানহানী ও মোটাংকের টাকা দাবির অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্ত ব্যবসায়ী রেজাউল করিম বাবলু জানান, লামা পৌরসভা ২নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা মোঃ উসমান গনি, পিতা নুর মোহাম্মদ মনগড়া কারোর শিখিয়ে দেয়া কল্পকহিনী বানিয়ে বান্দরবান কোর্টে ১টি ফৌজদারি অভিযোগ দায়ের করেন।

মিথ্যা ঘটনার বর্ননা দিয়ে মামলা দায়েরের পর প্রতারক উসমানগনি আমার কাছে তিন লাখ টাকা চেয়ে আপোষ করার প্রস্তাব দেয়। তার প্রস্তাবে আমি রাজি হই নাই। কারণ, এই মিথ্যা অভিযোগকারী উসমান গনি এর আগেও লামা থানা ও বিজ্ঞ আদালতে এক ফরেষ্ট রেঞ্জারসহ কয়েকজনের নামে দু’টি মিথ্যা মামলা করে।
ওই মামলা করে লামা জোত মালিক সমিতির তহবিল থেকে দেড় লাখ ও আমার কাছ থেকে ২৫ হাজার টাকা; দুই দফে ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা নিয়ে মামলা আপোষ করেন।” ব্যবসায়ী বাবলু আরো জানায়, “এই উসমান গনি কিছুদিন পরপর এই ধরনের মনগড়া অভিযোগ করে পরে আপোষের প্রস্তাব দিয়ে মোটাংকের অর্থ আদায় করা তার পেশায় রুপ নিয়েছে।”

এই মিথ্যা মামলাবাজ চক্রে আরো দু’তিন জন রয়েছে বলেও কাঠ ব্যবসায়ীরা দাবি করেন। ব্যবসায়ীদের হাতে এই চক্রের প্রতারণার অনেক ডকুমেন্টস রয়েছে বলেও জানান তারা।
উসমান গনি মামলার আর্জিতে দুইটি ঘটনার বর্নণা দিয়ে দাবি করে প্রথম ঘটনায় উল্লেখ করেন; “বিগত ০৯/১২/২০২৫ ইংরেজী তারিখ লামা পৌরসভার সোনালী ব্যাংকের সামনে থেকে তাকে লামা বন বিভাগের কার্যালয়ের পাশে নিয়ে গিয়ে গাছের সাথে বেঁধে মারধর করা হয়।
এতে উসমান গনির পেটে, পিঠে গুরুতর রক্তাক্ত জখম হয়। ওই সময় তার আত্মচিৎকারে আশেপাশের স্থানীয় লোকজন ও স্বাক্ষীগণ এগিয়ে আসলে আসামীগণ দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। লোকজন ও স্বাক্ষীরা উসমানকে উদ্ধার করে লামা সদর হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয় এবং জখম বেশি হওয়ায় কক্সবাজার হাসপাতালে রেফার করেন।”

এরপর ২য় ঘটনা ১৪ জুলাই ২৬ ইং তারিখ সকাল ১০টায় আলীকদম উপজেলাস্থ চৈক্ষ্যং ইউপির শিবাতলীপাড়ার পাশে বলে দাবি করা হয়। ওই ঘটনায়ও উসমান তার আর্জিতে উল্লেখ করেন, তাকে বেদম মারধর করে এবং খালি কার্টিজ পেপারে স্বাক্ষর করিয়ে নেন। এর পর আশপাশের মানুষজন ও স্বাক্ষীরা তাকে উদ্ধার করে লামা সরকারি হসপিটালে চিকিৎসা করায়।
এবিষয়ে আলীকদম থানায় অভিযোগ দিতে গেলে পুলিশ অভিযোগ নিতে গড়িমসি করায়; উসমান গনি বান্দরবান বিজ্ঞ সিনিয়র জুড়িশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলী আদালতে- ৩ এ মামলা দায়ের করেন।

মামলায় আসামী করা হয়; ১। মোস্তাফিজুর রহমান, পিতা- আহমদ হোসেন, সাং-মধুঝিরি, ৭ নং ওয়ার্ড, লামা পৌরসভা, ২ রেজাউল করিম বাবলু, পিতা-মৃত আবদুল খালেক, সাং- ২ নং ওয়ার্ড লামা পৌরসভা, ৩ । কেএম কবির উদ্দিন, পিতা আজাহার আলী খান, সাং-মধুঝিরি, ৭ নং ওয়ার্ড, লামা পৌরসভা, বান্দরবান ও রশিদ আহাম্মদ, পিতা- পুতু, সাং- বমুবিলছড়ি ইউনিয়ন চকরিয়া কক্সবাজার।
আর্জিতে ১নং আসামী যাকে করা হয়েছে, তিনি লামা বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ও ৩নং আসামী লামা বন বিভাগের সদর রেঞ্জ অফিসার। ৪ নং আসামী একজন রিক্সা চালক দিন মজুর ও ২ নং আসামী একজন ফার্ণিচার ব্যবসায়ী।
ব্যবসায়ীরা উসমান গনি গংয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে জানান, “উসমান গনি গং বন বিভাগের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করে অন্যায়

সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করছে। স্থানীয়ভাবে আমাদের সাথে উসমান গনি গংয়ের কোনো বিরোধ নেই। ইতোপূর্বে বন বিভাগের একজন রেঞ্জ অফিসারে বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ আনায়ন করে পৌনে দু’লাখ টাকা নিয়ে আপোষ করার ঘটনায় আমরা স্বাক্ষী ছিলাম। ৩ শ্ টাকার নন জুড়িসিয়াল স্টাম্পে স্বাক্ষর করে উসমান গনি আমাদের হাত থেকে টাকা নিয়েছিল।”
আর্জিতে উল্লেখিত ১ম ঘটনা স্থল বিভাগীয় বন কর্মকর্তার কার্যালয় মধুঝিরি একটি জনবহুল এলাকা। অনুসন্ধানকালে সেখানে বেশ কয়েকজন দোকানদার ও স্থানীয় লোকদের সাথে কথা বলে জানাযায়, উল্লিখত তারিখে বা আগে পরে এই ধরনের কোনো ঘটনা ঘটে নাই এবং শুনেও নাই তারা।

২য় ঘটনাস্থল লামা-আলীকদম সীমান্তবর্তী আলীকদম উপজেলাধীন শিবাতলীপাড়ার আশে-পাশে খোঁজ নিয়ে উক্তরুপ ঘটনার কোনো আলামত কিংবা স্বাক্ষী পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে, মালার স্বাক্ষী মাহবুব জানান, “আমি এবং আসিফ চৌধুরী নামের অপর একজন রাতের ৮ টায় ওসমানকে আহত অবস্থায় ফরেষ্ট অফিসের গোলঘর থেকে উদ্ধার করে লামা হসপিটালে চিকৎসা করাই।” উসমানকে কারা কেনো আহত করেছে জানতে চাওয়া হলে মামলার স্বাক্ষী মাহবুব বলেন,”ওই ঘটনার ২০ মিনিট আগে আমরা ব্যবসায়ী বাবলুর অনিয়মের বিষয়ে ফরেষ্ট অফিসে অভিযোগ করেছিলাম। অভিযুক্তরা ক্ষিপ্ত হয়ে উসমান গনিকে রিক্সা করে তুলে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন করেন।”
ডিএফও ও রেঞ্জ অফিসারকে কেনো অভিযুক্ত করা হয়েছে জানতে চাইলে স্বাক্ষী মাহবুব বলেন, “ফরেস্ট অফিসে অভিযোগ করার পরপরই উসমানকে তুলে নিয়ে গিয়ে মারধর করা হয়েছে, সুতরাং ওই হামলার পেছনে উনাদের হাত থাকতে পারে।” স্বাক্ষী মাহবুব আরো বলেন, ” আমরা কেউ সৎ নয়, সে কারণে সত্য সাক্ষ্যও কেউ দিচ্ছিনা।”
লামা জোত মালিক ব্যবসায়ী সমিতির নেতৃবৃন্দ এই মিথ্যা মামলার নিন্দা জানিয়ে বলেন, উসমান গনি আসলেই একজন মিথ্যাচারি ও মামলাবাজ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে, লামা বন বিভাগের সদর রেঞ্জ অফিসার কেএম কবির উদ্দিন বলেন, ‘আমি সদর রেঞ্জে যোগদান করেছি ৭/ ১২/২০২৫ ইং তারিখে; উসমান গনিকে আমি ঘটনাক্রমে চিনেছি কয়েক মাস পরে। যাকে আমি চিনতামও না, যোগদানের দু’দিনের মধ্যে তার সাথে আমার দ্বন্ধ হওয়ার কোনো কারণই থাকতে পারে না।” তিনি পুরো ঘটনাটিকে মিথ্যা নাটক হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে লামা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “আমার সঙ্গে উসমান গনির পরিচয় কিংবা ব্যক্তিগত আক্রোশ কোনোটাই নেই। বিজ্ঞ আদালতে আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগটি সত্য নয়।” তিনি আরো বলেন, ” আমি ও আমার রেঞ্জ অফিসারের পদপদবি উল্লেখ না করে শুধুমাত্র নাম পিতার নাম দিয়ে বিজ্ঞ আদালতে সত্য লুকিয়ে অসত্য ঘটনার বর্ননা দিয়ে মামলা করেয়েছেন; যা বেআইনি ও প্রতারণার সামিল।”
উল্লেখ্য; কোনো সরকারি কর্মকর্তাকে মিথ্যা মামলায় জড়ানো হলে আইনি সুরক্ষা পেতে উচ্চ আদালতে রিট, নিম্ন আদালতে জামিন বা মামলা বাতিলের আবেদন এবং মিথ্যা মামলাকারীর বিরুদ্ধে পাল্টা আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৬১এ ধারা অনুযায়ী মামলাটি বাতিল করার আবেদন করা যায়।

মিথ্যা মামলা বা হয়রানির অভিযোগ প্রমাণিত হলে মামলা দায়েরকারীর বিরুদ্ধে দণ্ডবিধি ২১১ ধারা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যায়, যার শাস্তি ২ থেকে ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড।
ফৌজদারি কার্যবিধির ২৫০ ধারা অনুযায়ী ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক মিথ্যা মামলার বাদীকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার সুযোগ থাকে।
এছাড়া সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে ঘটনাটি লিখিতভাবে জানানো ও দাপ্তরিক সহায়তা নেওয়া যায়।
বান্দরবান ট্রিবিউন ডেস্ক: 




















