
ট্রিভিউন ডেস্ক:
সাচিং প্রু জেরী (বান্দরবানের এমপি, বোমাং সার্কেলের রাজপরিবারের সদস্য এবং বিএনপির প্রভাবশালী নেতা)-কে মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ না দেওয়া হয় বা প্রস্তাব পেলেও তিনি কোনো কারণ দেখিয়ে গ্রহণ না করেন, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে।
দীপেন দেওয়ানের ১ জুন ২০২৬ তারিখে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী পদ থেকে পদত্যাগ একটি সাধারণ ঘটনা নয়। এটি পার্বত্য অঞ্চলের জটিল রাজনৈতিক, সামাজিক, জাতিগত ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণের একটি প্রতিফলন।
তিঁনি শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন(!) যা রাজনৈতিক জীবনে প্রায়শই ব্যবহৃত একটি ভদ্রতাসূচক ও আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা। কিন্তু পাহাড়ের বাস্তবতা, চুক্তির বাস্তবায়নের ঘাটতি, প্রতিমন্ত্রী নিয়োগজনিত বিতর্ক এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক খেলার প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এই পদত্যাগকে অনেকেই গভীর অসন্তোষ ও আস্থার সংকটের লক্ষণ হিসেবে দেখছেন।
দীপেন দেওয়ানের রাজনৈতিক যাত্রা ত্যাগ ও নিষ্ঠার এক উদাহরণ। রাঙ্গামাটিতে ১৯৬৩ সালে জন্মগ্রহণকারী এই নেতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে শিক্ষা সমাপ্ত করেন। পরিবারের চাপে সপ্তম বিসিএসে যোগ দিয়ে সিনিয়র যুগ্ম জেলা জজ হিসেবে প্রায় ১৯-২০ বছর চাকরি করেন। বিএনপির দুর্দিনে, বেগম খালেদা জিয়ার সরাসরি আহ্বানে ২০০৫-২০০৬ সালে তিনি স্বেচ্ছায় চাকরি ছেড়ে পূর্ণকালীন রাজনীতিতে আসেন। তার পিতা সুবিমল দেওয়ান জিয়াউর রহমানের আমলে উপজাতীয় বিষয়ক উপদেষ্টা/প্রতিমন্ত্রী মর্যাদায় দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
দীপেন দেওয়ান রাঙ্গামাটি জেলা বিএনপির সভাপতি হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন এবং ২০২৬ সালের নির্বাচনে রাঙ্গামাটি-২৯৯ আসন থেকে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে প্রথমবার এমপি হয়েই পূর্ণ মন্ত্রী হন। এই পথচলায় তিনি পাহাড়ে বিএনপির সাংগঠনিক ভিত মজবুত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন বলে দলীয় নেতৃত্ব মনে করে।
কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা কোনো একক ব্যক্তি বা সরকারের একার নয়। এখানে বাঙালি-পাহাড়ি বিভাজনের মূলে রয়েছে ঐতিহাসিক, প্রশাসনিক ও জনসংখ্যাগত পরিবর্তন। কাপ্তাই বাঁধ, সেনা অভিযান, ভূমি অধিগ্রহণ, বাঙালি অভিবাসন এবং স্বায়ত্তশাসনের দাবি। এসব কারণে দীর্ঘদিন ধরে আস্থার ঘাটতি বিদ্যমান।
১৯৯৭ সালের পার্বত্য শান্তি চুক্তি এই সংঘাত মেটানোর প্রধান দলিল। চুক্তির ‘ঘ’ খণ্ডের ১৯ ধারায় স্পষ্ট বলা হয়েছে: “উপজাতীয়দের মধ্য হইতে একজন মন্ত্রী নিয়োগ করিয়া পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক একটি মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করা হইবে।” এই ধারা উপজাতীয় প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার প্রতীক।
দীপেন দেওয়ানকে (উপজাতীয়) মন্ত্রী করা হয়েছিল, কিন্তু একই মন্ত্রণালয়ে চট্টগ্রাম-৫ থেকে নির্বাচিত অ-পাহাড়ি নেতা মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনকে প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ করায় ফেব্রুয়ারি মার্চ ২০২৬ সালে তীব্র অসন্তোষ দেখা দেয়। ৩৫ জন বিশিষ্ট পার্বত্য নাগরিকসহ জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) ও অন্যান্য সংগঠন এটিকে চুক্তির চেতনার পরিপন্থী বলে প্রতিবাদ করে। তারা দাবি করেন, মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে উপজাতীয় প্রতিনিধিত্ব ক্ষুণ্ন হচ্ছে এবং স্থানীয় জটিলতা, ভূমি, সংস্কৃতি ও স্বায়ত্তশাসনের বিষয়ে বহিরাগতের ধারণার ঘাটতি সমস্যা বাড়াতে পারে।
এই অসন্তোষের পটভূমিতে দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগকে অনেকে শুধু স্বাস্থ্যগত নয়, বরং প্রশাসনিক চাপ, সমন্বয়ের অভাব এবং পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতার ফল হিসেবে দেখছেন। পদত্যাগপত্রে সাধারণত ব্যক্তিগত, পারিবারিক বা স্বাস্থ্যগত কারণ উল্লেখ করা হয় ভদ্রতা ও রাজনৈতিক শিষ্টাচারের খাতিরে।

কিন্তু যদি সাচিং প্রু জেরী (বান্দরবানের এমপি, বোমাং সার্কেলের রাজপরিবারের সদস্য এবং বিএনপির প্রভাবশালী নেতা)-কে মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ না দেওয়া হয় বা প্রস্তাব পেলেও তিনি কোনো কারণ দেখিয়ে গ্রহণ না করেন, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে। সাচিং প্রু জেরী পাহাড়ের ঐতিহ্যবাহী নেতৃত্বের প্রতীক। তাঁর অনীহা বা উপেক্ষা পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মধ্যে ধারণা জন্মাতে পারে যে, বিএনপি সরকারও পূর্ববর্তী সরকারগুলোর মতো পার্বত্য ইস্যুতে স্পর্শকাতরতা দেখাচ্ছে না।
পাহাড়ের সমস্যা শুধু অভ্যন্তরীণ নয়। এখানে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক খেলা চলছে। আরাকান (রাখাইন) অঞ্চলে মায়ানমারের সংঘাতের প্রভাব পার্বত্য চট্টগ্রামে পড়ছে।
বিভিন্ন গোষ্ঠীর সন্ত্রাসী কার্যক্রম, অস্ত্র চোরাচালান, মাদক ও শরণার্থী সংকট বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠছে। পাকিস্তানের আইএসআই, তুরস্কের এমআইটি এবং আমেরিকান গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নজরদারি বৃদ্ধির অভিযোগও বিভিন্ন মহলে আলোচিত। কেউ কেউ ‘জুমল্যান্ড’ গঠনের দাবিকে খ্রিস্টান অধ্যুষিত আলাদা রাষ্ট্র তৈরির ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখেন, যা ভারত-বাংলাদেশ-মায়ানমারের সীমান্তবর্তী অঞ্চলকে ঘিরে চলছে।
ভারতের ‘চিকেন নেক’ (সিলিগুড়ি করিডোর) নিয়ে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার টুইট ও বক্তব্যে চট্টগ্রামকেও দ্বিতীয় চিকেন নেক হিসেবে উল্লেখ করে হুমকির আভাস দিয়েছেন, যা পাহাড়ের স্থিতিশীলতাকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
পাহাড়ে র্যাডিক্যাল গোষ্ঠীর অবাধ যাতায়াত ও ক্ষমতা বৃদ্ধির অভিযোগও নতুন নয়। এসব মিলিয়ে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর একাংশের মধ্যে গভীর অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। তারা মনে করেন, চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন না হলে, ভূমি অধিকার, স্বায়ত্তশাসন ও সাংস্কৃতিক সুরক্ষা নিশ্চিত না হলে কোনো সরকারই তাদের আস্থা অর্জন করতে পারবে না।
দীপেন দেওয়ানের মতো ত্যাগী নেতার পদত্যাগ যদি এই অসন্তোষের প্রকাশ হয়, তবে সাচিং প্রু জেরীর মতো প্রভাবশালী নেতাকে দ্রুত মন্ত্রিত্ব না দিলে বা তিনি গ্রহণ না করলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এখানকার সমস্যার সমাধান শুধু প্রশাসনিক নয়, রাজনৈতিক সংলাপ, চুক্তির আত্মিক বাস্তবায়ন এবং সকল জনগোষ্ঠীর (বাঙালি-পাহাড়ি) সম্মিলিত উন্নয়নের মাধ্যমে সম্ভব। দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগ যদি সত্যিকারের স্বাস্থ্যগত কারণে হয়, তবে তাঁর সুস্থতা কামনা করি।
কিন্তু যদি এর পেছনে গভীর অসন্তোষ, প্রতিনিধিত্বের সংকট ও ভূ-রাজনৈতিক চাপ থাকে, তাহলে সরকারের উচিত দ্রুত পাহাড়ি নেতৃত্বকে সম্মানজনকভাবে অন্তর্ভুক্ত করে আস্থা পুনর্নির্মাণ করা। অন্যথায় পাহাড়ের অস্থিরতা শুধু স্থানীয় নয়, জাতীয় নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্যও হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
সূত্র: নিপুন চন্দ্র, মফস্বল সম্পাদক দৈনিক বর্তমান বাংলা
Reporter Name 




















