Lama ০৭:০৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শরীয়তপুর ইসলামিয়া মহিলা দাখিল মাদ্রাসায় পাশের হার শূন্য: চরম হতাশায় অভিভাবক মহল

শরীয়তপুর ইসলামিয়া মহিলা দাখিল মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার ২৮ বছর পেরিয়ে গেলেও শিক্ষার মানোন্নয়নে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। ২০২৬ সালের দাখিল পরীক্ষায় এ প্রতিষ্ঠান থেকে অংশ নেওয়া পাঁচজন শিক্ষার্থীর কেউই কৃতকার্য হয়নি। এতে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও এলাকাবাসীর মধ্যে চরম হতাশা দেখা দিয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও এলাকাবাসীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে নানা সমস্যা ও অনিয়মের মধ্য দিয়ে চলছে মাদ্রাসাটির কার্যক্রম। দায়িত্বে থাকা ভারপ্রাপ্ত সুপারের অবহেলা ও গাফিলতির কারণে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার পরিবেশ ও ফলাফল দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে বলেও অভিযোগ তাদের।

মাদ্রাসা সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০১০ সালে এমপিওভুক্ত হয়ে শিক্ষা বোর্ডের তালিকাভুক্ত হয় মাদ্রাসাটি। অভিযোগ রয়েছে, এমপিওভুক্তির পর প্রতিষ্ঠাকালীন সুপার মোর্শেদ আলমকে সরিয়ে দিয়ে সহকারী শিক্ষিকা তহিরুন নেছাকে ভারপ্রাপ্ত সুপারের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এরপর থেকেই প্রতিষ্ঠানটি অনেকটা উদ্দেশ্যহীনভাবে চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সূত্র জানায়, তহিরুন নেছা ২০২৪ সালের ২৯ আগস্ট দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর জন্য পদত্যাগপত্র জমা দেন। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠাকালীন সুপার মোর্শেদ আলম আবার দায়িত্বে ফিরে আসেন। তবে কিছুদিন পর পুনরায় তহিরুন নেছা ভারপ্রাপ্ত সুপারের দায়িত্ব নেন।

শিক্ষক-কর্মচারীদের কয়েকজনের অভিযোগ, ভারপ্রাপ্ত সুপার কার্যদিবসের বেশির ভাগ সময় ঢাকায় অবস্থান করেন। ফলে নিয়মিতভাবে প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় ব্যাঘাত ঘটছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ভারপ্রাপ্ত সুপার।

বর্তমানে শিশু শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত মাদ্রাসাটিতে প্রায় ১৫০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে বলে দাবি করেছেন ভারপ্রাপ্ত সুপার তহিরুন নেছা। প্রতিষ্ঠানটিতে ভারপ্রাপ্ত সুপার, সহকারী শিক্ষক ও কর্মচারীসহ মোট ১৪ জন কর্মরত রয়েছেন বলে মাদ্রাসা সূত্র জানিয়েছে।

২০২৬ সালের দাখিল পরীক্ষায় মাদ্রাসাটি থেকে পাঁচজন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। ফলাফল প্রকাশের পর দেখা যায়, পাঁচজনের কেউই পাস করেনি। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটির পাশের হার দাঁড়িয়েছে শূন্য শতাংশে।

শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও এলাকাবাসীর অভিযোগ, শিক্ষক মণ্ডলীর একটি বড় অংশ যথাযথভাবে পাঠদান করছেন না। প্রতিষ্ঠানটি নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলছে বলেও অভিযোগ তাদের। তাদের দাবি, শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত না হলে মাদ্রাসাটির শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।

অভিভাবকদের কেউ কেউ আরও অভিযোগ করেন, বর্তমান ভারপ্রাপ্ত সুপার আগে সহকারী মৌলভী পদে কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠাকালীন সুপার মোর্শেদ আলমের স্ত্রী হওয়ার সুবাদে তিনি দ্রুত সহকারী সুপারের দায়িত্ব পান। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে কয়েকজন শিক্ষক-কর্মচারী অভিযোগ করেন, এর আগে ভারপ্রাপ্ত সুপার তহিরুন নেছা প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র ও ব্যাংকসংক্রান্ত নথিসহ প্রায় ছয় মাস আত্মগোপনে ছিলেন। এ সময় শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পেতে সমস্যায় পড়তে হয়। বেতন-ভাতা পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে বিভিন্ন সময়ে শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হলেও দীর্ঘ সময়েও এর কোনো সমাধান হয়নি বলেও অভিযোগ তাদের।

শিক্ষক-কর্মচারীদের আরও অভিযোগ, ভারপ্রাপ্ত সুপার নিয়মিত উপস্থিত না থাকলেও পরবর্তীতে এসে হাজিরা খাতায় আগের দিনের স্বাক্ষর করে দেন। চলতি মাসের ৩০ আগস্ট থেকে ২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি অনুপস্থিত থাকার পর ৩ সেপ্টেম্বর এসে আগের দিনগুলোর হাজিরায় স্বাক্ষর করেছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ভারপ্রাপ্ত সুপার তহিরুন নেছা বলেন, “আমার প্রতিষ্ঠান খুব সুন্দরভাবে চলছে। যে শিক্ষার্থীরা এবার দাখিল পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল, তাদের বেশির ভাগই বিবাহিত ছিল। এ কারণে তারা পরীক্ষায় কৃতকার্য হতে পারেনি। আগামীতে যারা পরীক্ষা দেবে, তাদের ভালোভাবে প্রস্তুত করে পরীক্ষাকেন্দ্রে পাঠানো হবে।”

তিনি আরও বলেন, “শিক্ষক-কর্মচারীদের হাজিরা খাতা ঠিকঠাক রয়েছে। শ্রেণিকক্ষের কিছুটা সংকট রয়েছে। তবে তা মানিয়ে নিয়ে নিয়মিত পাঠদান দেওয়া হচ্ছে।”

এ বিষয়ে শরীয়তপুর সদর উপজেলা শিক্ষা অফিসার আনন্দময় ভৌমিক বলেন, “শতভাগ অকৃতকার্যের তালিকায় থাকা শরীয়তপুর ইসলামিয়া মহিলা দাখিল মাদ্রাসার সুপারকে কারণ দর্শানো হয়েছে। তিনি যে জবাব দিয়েছেন, তা সন্তোষজনক নয়। বিষয়টি লিখিতভাবে অধিদপ্তরে পাঠানো হবে। অধিদপ্তর যে সিদ্ধান্ত দেবে, সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

Popular Post

লামা প্রেসক্লাব নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টির অপচেষ্টা, সদস্যদের হুমকি

Bandarban Tribune

শরীয়তপুর ইসলামিয়া মহিলা দাখিল মাদ্রাসায় পাশের হার শূন্য: চরম হতাশায় অভিভাবক মহল

Update Time : ০৭:০৪:০৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শরীয়তপুর ইসলামিয়া মহিলা দাখিল মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার ২৮ বছর পেরিয়ে গেলেও শিক্ষার মানোন্নয়নে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। ২০২৬ সালের দাখিল পরীক্ষায় এ প্রতিষ্ঠান থেকে অংশ নেওয়া পাঁচজন শিক্ষার্থীর কেউই কৃতকার্য হয়নি। এতে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও এলাকাবাসীর মধ্যে চরম হতাশা দেখা দিয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও এলাকাবাসীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে নানা সমস্যা ও অনিয়মের মধ্য দিয়ে চলছে মাদ্রাসাটির কার্যক্রম। দায়িত্বে থাকা ভারপ্রাপ্ত সুপারের অবহেলা ও গাফিলতির কারণে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার পরিবেশ ও ফলাফল দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে বলেও অভিযোগ তাদের।

মাদ্রাসা সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০১০ সালে এমপিওভুক্ত হয়ে শিক্ষা বোর্ডের তালিকাভুক্ত হয় মাদ্রাসাটি। অভিযোগ রয়েছে, এমপিওভুক্তির পর প্রতিষ্ঠাকালীন সুপার মোর্শেদ আলমকে সরিয়ে দিয়ে সহকারী শিক্ষিকা তহিরুন নেছাকে ভারপ্রাপ্ত সুপারের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এরপর থেকেই প্রতিষ্ঠানটি অনেকটা উদ্দেশ্যহীনভাবে চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সূত্র জানায়, তহিরুন নেছা ২০২৪ সালের ২৯ আগস্ট দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর জন্য পদত্যাগপত্র জমা দেন। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠাকালীন সুপার মোর্শেদ আলম আবার দায়িত্বে ফিরে আসেন। তবে কিছুদিন পর পুনরায় তহিরুন নেছা ভারপ্রাপ্ত সুপারের দায়িত্ব নেন।

শিক্ষক-কর্মচারীদের কয়েকজনের অভিযোগ, ভারপ্রাপ্ত সুপার কার্যদিবসের বেশির ভাগ সময় ঢাকায় অবস্থান করেন। ফলে নিয়মিতভাবে প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় ব্যাঘাত ঘটছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ভারপ্রাপ্ত সুপার।

বর্তমানে শিশু শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত মাদ্রাসাটিতে প্রায় ১৫০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে বলে দাবি করেছেন ভারপ্রাপ্ত সুপার তহিরুন নেছা। প্রতিষ্ঠানটিতে ভারপ্রাপ্ত সুপার, সহকারী শিক্ষক ও কর্মচারীসহ মোট ১৪ জন কর্মরত রয়েছেন বলে মাদ্রাসা সূত্র জানিয়েছে।

২০২৬ সালের দাখিল পরীক্ষায় মাদ্রাসাটি থেকে পাঁচজন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। ফলাফল প্রকাশের পর দেখা যায়, পাঁচজনের কেউই পাস করেনি। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটির পাশের হার দাঁড়িয়েছে শূন্য শতাংশে।

শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও এলাকাবাসীর অভিযোগ, শিক্ষক মণ্ডলীর একটি বড় অংশ যথাযথভাবে পাঠদান করছেন না। প্রতিষ্ঠানটি নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলছে বলেও অভিযোগ তাদের। তাদের দাবি, শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত না হলে মাদ্রাসাটির শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।

অভিভাবকদের কেউ কেউ আরও অভিযোগ করেন, বর্তমান ভারপ্রাপ্ত সুপার আগে সহকারী মৌলভী পদে কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠাকালীন সুপার মোর্শেদ আলমের স্ত্রী হওয়ার সুবাদে তিনি দ্রুত সহকারী সুপারের দায়িত্ব পান। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে কয়েকজন শিক্ষক-কর্মচারী অভিযোগ করেন, এর আগে ভারপ্রাপ্ত সুপার তহিরুন নেছা প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র ও ব্যাংকসংক্রান্ত নথিসহ প্রায় ছয় মাস আত্মগোপনে ছিলেন। এ সময় শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পেতে সমস্যায় পড়তে হয়। বেতন-ভাতা পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে বিভিন্ন সময়ে শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হলেও দীর্ঘ সময়েও এর কোনো সমাধান হয়নি বলেও অভিযোগ তাদের।

শিক্ষক-কর্মচারীদের আরও অভিযোগ, ভারপ্রাপ্ত সুপার নিয়মিত উপস্থিত না থাকলেও পরবর্তীতে এসে হাজিরা খাতায় আগের দিনের স্বাক্ষর করে দেন। চলতি মাসের ৩০ আগস্ট থেকে ২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি অনুপস্থিত থাকার পর ৩ সেপ্টেম্বর এসে আগের দিনগুলোর হাজিরায় স্বাক্ষর করেছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ভারপ্রাপ্ত সুপার তহিরুন নেছা বলেন, “আমার প্রতিষ্ঠান খুব সুন্দরভাবে চলছে। যে শিক্ষার্থীরা এবার দাখিল পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল, তাদের বেশির ভাগই বিবাহিত ছিল। এ কারণে তারা পরীক্ষায় কৃতকার্য হতে পারেনি। আগামীতে যারা পরীক্ষা দেবে, তাদের ভালোভাবে প্রস্তুত করে পরীক্ষাকেন্দ্রে পাঠানো হবে।”

তিনি আরও বলেন, “শিক্ষক-কর্মচারীদের হাজিরা খাতা ঠিকঠাক রয়েছে। শ্রেণিকক্ষের কিছুটা সংকট রয়েছে। তবে তা মানিয়ে নিয়ে নিয়মিত পাঠদান দেওয়া হচ্ছে।”

এ বিষয়ে শরীয়তপুর সদর উপজেলা শিক্ষা অফিসার আনন্দময় ভৌমিক বলেন, “শতভাগ অকৃতকার্যের তালিকায় থাকা শরীয়তপুর ইসলামিয়া মহিলা দাখিল মাদ্রাসার সুপারকে কারণ দর্শানো হয়েছে। তিনি যে জবাব দিয়েছেন, তা সন্তোষজনক নয়। বিষয়টি লিখিতভাবে অধিদপ্তরে পাঠানো হবে। অধিদপ্তর যে সিদ্ধান্ত দেবে, সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”