Lama ০৫:৫৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ইলিশ এখন স্বপ্নের মাছ

চট্টগ্রাম- মিরসরাইয়ে ভরা মৌসুমেও ইলিশের দেখা মিলছেনা

  • মোঃ সেলিম
  • Update Time : ১১:৪৩:২৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১ অগাস্ট ২০২৬
  • ৩২ Time View

মিরসরাইয়ে ভরা মৌসুমেও ইলিশের দেখা মিলছেনা। ইলিশ যেন অচেনা স্বাদের মাছ। শ্রাবণের ভরা মৌসুমেও মিরসরাইয়ের হাটে–ঘাটে ইলিশের আকাল চলছে। দামের ঊর্ধ্বগতিতে নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা ইলিশ কেনার স্বপ্নই যেন ছেড়ে দিয়েছেন।

যে পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে, তাতে আগামী দিনে উচ্চবিত্তের রসনা বিলাসের জন্যও ইলিশ মিলবে কিনা তা নিয়েও সন্দেহ দেখা দিয়েছে। কয়েক বছর আগেও এই সময়ে উপজেলার সাহেরখালী ঘাট, চাঁদপুর ও কুমিরা থেকে প্রচুর ইলিশ আসত স্থানীয় বাজারে। এখন বাজারে যেমন হাহাকার, তেমনই ঘাটে গিয়েও হতাশ হয়ে ফিরছেন ক্রেতারা। শুধু ক্রেতা নন, সাগরে ইলিশ না পেয়ে জেলেরাও চরম হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন।

বিজ্ঞাপন

সমপ্রতি বাজারগুলোর চিত্র এমন রূপ ধারণ করেছে যে, কদাচিৎ হাতেগোনা কিছু ছোট ও মাঝারি সাইজের ইলিশ বাজারে এলে ক্রেতারা হুমড়ি খেয়ে পড়েন। কিন্তু দাম শুনে চোখের দেখা দেখেই তাদের ক্ষান্ত হতে হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত সাধ মিটিয়ে সাধ্যের মধ্যে অন্য মাছ নিয়ে বাড়ি ফিরছেন সাধারণ মানুষ। মিরসরাই পৌর সদর হাট, বড়তাকিয়া ও মিঠাছড়া বাজার সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, ৩০০ থেকে ৪০০ গ্রাম ওজনের জাটকা সাইজের ইলিশের কেজিই এক হাজার টাকার ওপরে। আধা কেজির চেয়ে একটু বড় ইলিশের কেজি বিক্রি হচ্ছে ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকায়। আর এক কেজি ওজনের দু–একটি ইলিশ বাজারে এলে তার দাম হাঁকা হচ্ছে ২২০০ থেকে ৩০০০ টাকা পর্যন্ত।

গত বৃহস্পতিবার মিঠাছড়া হাটে ইলিশের খাঁচার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা চাকরিজীবী ক্রেতা সেলিম বলেন, ভাই, ছেলেমেয়েরা ইলিশ খেতে চাইছে। কিন্তু বর্তমান দামে ছোট ইলিশ কেনাও আমার পক্ষে সম্ভব না। তাই বাড়ি গিয়ে বলতে হবে আজ বাজারে ইলিশই ওঠেনি। এদিকে ইলিশ বিক্রেতা সুমন জলদাস (৩৪) বলেন, বড় ভাই, আমরাও নিরুপায়। এই কটা ইলিশই ১৪০০ টাকা কেজি দরে ঘাট থেকে কিনে এনেছি। আমাদেরও তো এটা বিক্রি করে সংসারের চাল–ডাল কিনে বাড়ি ফিরতে হবে।

মিরসরাই অঞ্চলের প্রসিদ্ধ ইলিশ ঘাট হিসেবে পরিচিত সাহেরখালীর ডোমখালী। প্রতি বছর ইলিশের জোঁ (মাছ ধরার মৌসুমী জোয়ার) এলে এই ঘাটে ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় থাকে। সকাল–বিকেলে জেলেরা জাল ও তাজা মাছ নিয়ে ঘাটে ফিরলে সরাসরি সেখান থেকে ইলিশ কেনা অনেকের পছন্দের। কিন্তু এবার ভরা মৌসুমেও চিত্র পুরো উল্টো। ডোমখালী ঘাটে গিয়ে প্রায় সকল ক্রেতাকেই খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে।

সম্প্রতি ডোমখালী ঘাটে ইলিশ কিনতে যাওয়া স্থানীয় চাকরিজীবী মামুনুর রশিদ (৪২) বলেন, অনেক আশা নিয়ে খুব ভোরে ঘাটে গিয়েছিলাম। কিন্তু গিয়ে দেখি সব জেলে অন্য মাছ নিয়ে ফিরছেন। মাত্র দুজন জেলের কাছে কয়েকটি ইলিশ দেখা গেল। একজনের জালে অন্য মাছের সাথে মাত্র ৩টি, আর একজনের জালে ছোট–বড় মিলিয়ে ৭টি ইলিশ ধরা পড়েছে।

কিন্তু জেলেরা যে দাম চাইলেন, সেই দামে ইলিশ কেনা অসম্ভব।
জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাগরে ইলিশের তীব্র আকাল চলছে। জেলেরা জানান, কয়েকজন মিলে টানা দুদিন সমুদ্রে জাল ফেলেও মাত্র কয়েকটি ইলিশ পেয়েছেন। তাদের শ্রম, নৌকার জ্বালানি তেল ও খাওয়ার খরচ মিলিয়ে যে টাকা ব্যয় হয়েছে, মাছ বিক্রি করে সেই খরচই উঠছে না। ফলে লোকসান এড়াতে বেশি দাম চাওয়া ছাড়া জেলেরা ও নিরুপায়। সব মিলিয়ে মিরসরাইয়ের উপকূলীয় এই ইলিশ ঘাটে এখন কেবলই হতাশার চিত্র।

মিরসরাইয়ের সাহেরখালী ও ডোমখালী উপকূলীয় চ্যানেলে ঐতিহ্যবাহী রূপালী ইলিশের উৎপাদন আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ার পেছনে পরিবেশগত বিপর্যয়কে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। উপজেলার পরিবেশ সচেতন ব্যক্তিত্ব প্রফেসর ডা. জামশেদ আলম বলেন, শিল্পবর্জ্য দূষণ এবং অনিয়ন্ত্রিত ড্রেজিংয়ের কারণেই এই বিপর্যয় ঘটেছে।

দেশের অন্যতম প্রধান এই ইলিশ প্রজনন অঞ্চলটি বর্তমানে চরম পরিবেশগত সংকটের মুখোমুখি। তিনি দাবি করেন, সাহেরখালী ঘাটে ইলিশ না পাওয়ার পেছনে নির্দিষ্ট কিছু মানবসৃষ্ট ও প্রাকৃতিক কারণ দায়ী।

বিজ্ঞাপন

মিরসরাই উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আরিফুর রহমান বলেন, গেল কয়েক বছর ধরেই এই অঞ্চলের উপকূলে হতাশাজনক হারে ইলিশ হ্রাস পাচ্ছে। পরিসংখ্যানেও এই চিত্র স্পষ্ট। তিনি আরও জানান, মূলত জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ইলিশসহ অন্যান্য মাছ সাগরে কম পাওয়া যাচ্ছে।

তাছাড়া বন্যা হলে সাগরের উপরিভাগের পানির লবণাক্ততা কমে যায় এবং পরিবেশগত প্যারামিটারগুলো ওঠানামা করে। মৎস্য কর্মকর্তা জানান, এই উপকূলের ইলিশ রক্ষায় এসব কারণ উল্লেখ করে আগামীতে সরকারের নীতি–নির্ধারণী পর্যায়ে কিছু প্রস্তাবনা পাঠাবেন তিনি।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

Popular Post

কক্সবাজারে আইন-শৃঙ্খলা, সুশাসন নিশ্চিতকরণ ও মাদক বিরোধী বিশেষ সভা

Bandarban Tribune

ইলিশ এখন স্বপ্নের মাছ

চট্টগ্রাম- মিরসরাইয়ে ভরা মৌসুমেও ইলিশের দেখা মিলছেনা

Update Time : ১১:৪৩:২৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১ অগাস্ট ২০২৬

মিরসরাইয়ে ভরা মৌসুমেও ইলিশের দেখা মিলছেনা। ইলিশ যেন অচেনা স্বাদের মাছ। শ্রাবণের ভরা মৌসুমেও মিরসরাইয়ের হাটে–ঘাটে ইলিশের আকাল চলছে। দামের ঊর্ধ্বগতিতে নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা ইলিশ কেনার স্বপ্নই যেন ছেড়ে দিয়েছেন।

যে পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে, তাতে আগামী দিনে উচ্চবিত্তের রসনা বিলাসের জন্যও ইলিশ মিলবে কিনা তা নিয়েও সন্দেহ দেখা দিয়েছে। কয়েক বছর আগেও এই সময়ে উপজেলার সাহেরখালী ঘাট, চাঁদপুর ও কুমিরা থেকে প্রচুর ইলিশ আসত স্থানীয় বাজারে। এখন বাজারে যেমন হাহাকার, তেমনই ঘাটে গিয়েও হতাশ হয়ে ফিরছেন ক্রেতারা। শুধু ক্রেতা নন, সাগরে ইলিশ না পেয়ে জেলেরাও চরম হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন।

বিজ্ঞাপন

সমপ্রতি বাজারগুলোর চিত্র এমন রূপ ধারণ করেছে যে, কদাচিৎ হাতেগোনা কিছু ছোট ও মাঝারি সাইজের ইলিশ বাজারে এলে ক্রেতারা হুমড়ি খেয়ে পড়েন। কিন্তু দাম শুনে চোখের দেখা দেখেই তাদের ক্ষান্ত হতে হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত সাধ মিটিয়ে সাধ্যের মধ্যে অন্য মাছ নিয়ে বাড়ি ফিরছেন সাধারণ মানুষ। মিরসরাই পৌর সদর হাট, বড়তাকিয়া ও মিঠাছড়া বাজার সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, ৩০০ থেকে ৪০০ গ্রাম ওজনের জাটকা সাইজের ইলিশের কেজিই এক হাজার টাকার ওপরে। আধা কেজির চেয়ে একটু বড় ইলিশের কেজি বিক্রি হচ্ছে ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকায়। আর এক কেজি ওজনের দু–একটি ইলিশ বাজারে এলে তার দাম হাঁকা হচ্ছে ২২০০ থেকে ৩০০০ টাকা পর্যন্ত।

গত বৃহস্পতিবার মিঠাছড়া হাটে ইলিশের খাঁচার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা চাকরিজীবী ক্রেতা সেলিম বলেন, ভাই, ছেলেমেয়েরা ইলিশ খেতে চাইছে। কিন্তু বর্তমান দামে ছোট ইলিশ কেনাও আমার পক্ষে সম্ভব না। তাই বাড়ি গিয়ে বলতে হবে আজ বাজারে ইলিশই ওঠেনি। এদিকে ইলিশ বিক্রেতা সুমন জলদাস (৩৪) বলেন, বড় ভাই, আমরাও নিরুপায়। এই কটা ইলিশই ১৪০০ টাকা কেজি দরে ঘাট থেকে কিনে এনেছি। আমাদেরও তো এটা বিক্রি করে সংসারের চাল–ডাল কিনে বাড়ি ফিরতে হবে।

মিরসরাই অঞ্চলের প্রসিদ্ধ ইলিশ ঘাট হিসেবে পরিচিত সাহেরখালীর ডোমখালী। প্রতি বছর ইলিশের জোঁ (মাছ ধরার মৌসুমী জোয়ার) এলে এই ঘাটে ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় থাকে। সকাল–বিকেলে জেলেরা জাল ও তাজা মাছ নিয়ে ঘাটে ফিরলে সরাসরি সেখান থেকে ইলিশ কেনা অনেকের পছন্দের। কিন্তু এবার ভরা মৌসুমেও চিত্র পুরো উল্টো। ডোমখালী ঘাটে গিয়ে প্রায় সকল ক্রেতাকেই খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে।

সম্প্রতি ডোমখালী ঘাটে ইলিশ কিনতে যাওয়া স্থানীয় চাকরিজীবী মামুনুর রশিদ (৪২) বলেন, অনেক আশা নিয়ে খুব ভোরে ঘাটে গিয়েছিলাম। কিন্তু গিয়ে দেখি সব জেলে অন্য মাছ নিয়ে ফিরছেন। মাত্র দুজন জেলের কাছে কয়েকটি ইলিশ দেখা গেল। একজনের জালে অন্য মাছের সাথে মাত্র ৩টি, আর একজনের জালে ছোট–বড় মিলিয়ে ৭টি ইলিশ ধরা পড়েছে।

কিন্তু জেলেরা যে দাম চাইলেন, সেই দামে ইলিশ কেনা অসম্ভব।
জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাগরে ইলিশের তীব্র আকাল চলছে। জেলেরা জানান, কয়েকজন মিলে টানা দুদিন সমুদ্রে জাল ফেলেও মাত্র কয়েকটি ইলিশ পেয়েছেন। তাদের শ্রম, নৌকার জ্বালানি তেল ও খাওয়ার খরচ মিলিয়ে যে টাকা ব্যয় হয়েছে, মাছ বিক্রি করে সেই খরচই উঠছে না। ফলে লোকসান এড়াতে বেশি দাম চাওয়া ছাড়া জেলেরা ও নিরুপায়। সব মিলিয়ে মিরসরাইয়ের উপকূলীয় এই ইলিশ ঘাটে এখন কেবলই হতাশার চিত্র।

মিরসরাইয়ের সাহেরখালী ও ডোমখালী উপকূলীয় চ্যানেলে ঐতিহ্যবাহী রূপালী ইলিশের উৎপাদন আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ার পেছনে পরিবেশগত বিপর্যয়কে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। উপজেলার পরিবেশ সচেতন ব্যক্তিত্ব প্রফেসর ডা. জামশেদ আলম বলেন, শিল্পবর্জ্য দূষণ এবং অনিয়ন্ত্রিত ড্রেজিংয়ের কারণেই এই বিপর্যয় ঘটেছে।

দেশের অন্যতম প্রধান এই ইলিশ প্রজনন অঞ্চলটি বর্তমানে চরম পরিবেশগত সংকটের মুখোমুখি। তিনি দাবি করেন, সাহেরখালী ঘাটে ইলিশ না পাওয়ার পেছনে নির্দিষ্ট কিছু মানবসৃষ্ট ও প্রাকৃতিক কারণ দায়ী।

বিজ্ঞাপন

মিরসরাই উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আরিফুর রহমান বলেন, গেল কয়েক বছর ধরেই এই অঞ্চলের উপকূলে হতাশাজনক হারে ইলিশ হ্রাস পাচ্ছে। পরিসংখ্যানেও এই চিত্র স্পষ্ট। তিনি আরও জানান, মূলত জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ইলিশসহ অন্যান্য মাছ সাগরে কম পাওয়া যাচ্ছে।

তাছাড়া বন্যা হলে সাগরের উপরিভাগের পানির লবণাক্ততা কমে যায় এবং পরিবেশগত প্যারামিটারগুলো ওঠানামা করে। মৎস্য কর্মকর্তা জানান, এই উপকূলের ইলিশ রক্ষায় এসব কারণ উল্লেখ করে আগামীতে সরকারের নীতি–নির্ধারণী পর্যায়ে কিছু প্রস্তাবনা পাঠাবেন তিনি।