
বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের অর্থায়নে সম্প্রতি থানচি উপজেলায় সাম্প্রতিক আকস্মিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য বিতরণ করা ত্রাণ নিয়ে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত অনেক পরিবার ত্রাণ না পেলেও প্রভাবশালী ও দলীয় পছন্দের ব্যক্তিদের তালিকাভুক্ত করে সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্তদের দাবি; তালিকা প্রস্তুতিতে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত চেয়ারম্যান ও সদস্যদের যথাযথভাবে সম্পৃক্ত করা হয়নি। তার বিপরীতে সরকারদলীয় নেতাকর্মী ও প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তার মাধ্যমে তালিকা প্রস্তুত হওয়ায় স্বজনপ্রীতির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বন্যাকবলিত মানুষের সহায়তায় বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ থানচি উপজেলার ৪ ইউনিয়নের জন্য ১২.৫০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেয়। এর আগে বন্যাকালীন সময়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে উপজেলা প্রশাসনকে ১০ মেট্রিক টন চাল ও ১ লাখ টাকা এবং বন্যা-পরবর্তী সময়ে আরও ২০ মেট্রিক টন চাল ও ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।
বেসরকারী এনজিও সংস্থা ব্র্যাক বন্যা চলাকালীণ সময়ে ২০০ পরিবারকে খাদ্য সহায়তা দিয়েছে। এদিকে বিএনকেএস ৪০০ পরিবারের জন্য নগদসহ ৮ হাজার টাকা মূল্যের ১১ ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী, কারিতাস বাংলাদেশ স্বেচ্ছা সেবী সংগঠন ও ত্রাণ সহায়তা প্রস্তুতি নিয়েছে।

এর আগে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে ত্রাণসামগ্রী সহায়তা এবং বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা প্রদান করেন।
সরেজমিনে নতুনপাড়া গ্রামের বাসিন্দা নিয়াজুর রহমান বলেন, “আমাদের গ্রাম থেকে ৬৫টি পরিবার আশ্রয়কেন্দ্রে ছিল। বন্যার সময় প্রশাসন শুকনো খাবার ও ত্রাণ দিয়েছিল। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার জেলা পরিষদের ত্রাণ সহায়তার মাত্র ১২টি পরিবার চাল পেয়েছে। বাকি পরিবারগুলো চেয়ে চেয়ে দেখেছে। বিষয়টি খুবই কষ্টদায়ক।”
একই গ্রামের মোহাম্মদ বেলাল হোসেন (৪৫), প্রকাশ মল্লিক, পলাশ মল্লিক ও আল মামুন (৪৮) বলেন, “২০২৩ সালের বন্যায় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, সদস্য ও সংরক্ষিত সদস্যরা তালিকা করে সবাইকে সহায়তা দিয়েছে। এবার রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও প্রশাসনের মাধ্যমে তালিকা হওয়ায় আমাদের নাম বাদ পড়েছে বলে মনে হচ্ছে।”

রেজিয়া বেগম (৫২) বলেন, “ভোটের সময় আমরা দল দেখি না, মানুষ দেখে ভোট দিই। এখন বৃদ্ধ বয়সে কার কাছে অভিযোগ করব? আল্লাহর ওপর ভরসা ছাড়া উপায় নেই।”
ছাংদাক পাড়া বাসিন্দা সুইথুইঅং মারমা বলেন, “অন্যের নিকট থেকে ২ একর জায়গা বর্গা নিই, বন্যায় আমার ধান ও সাথী ফসল সব শেষ। এবারে খোরাক না হলে পরিবার নিয়ে পথে বসতে হবে। এখন ও কোন প্রকার সহায়তা পাইনি।”
সদর ইউপি চেয়ারম্যান অংপ্রু ম্রো, বলীপাড়া ইউপি চেয়ারম্যান জিয়াঅং মারমা, তিন্দু বলেন, “বন্যা ও পাহাড়ধসে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রণয়ন প্রস্তুতিতে কিংবা চাল বিতরণে আমাদের কোনো সদস্যকে সম্পৃক্ত রাখা হয়নি। রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা নিজেদের মতো করে তালিকা প্রস্তুত বা তৈরি করে জমা দিয়েছেন।”

স্থানীয় সংবাদকর্মী চিংথোয়াইঅং মারমা ও উশৈনু মারমা বলেন, “জেলা পরিষদের অর্থায়নে পরিচালিত ত্রাণ সহায়তা কার্যক্রমের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ত্রাণ বিতরণের সময় জনপ্রতিনিধি ও গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়নি, ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ আরও বেড়েছে।”
রুনাজনপাড়া গ্রামের সূজন ত্রিপুরা (৪০) বলেন, “আমাদের ৩০টি পরিবারের ঘরবাড়ি ও ফসলের ক্ষতি হয়েছে। অথচ তালিকায় আমাদের কারও নাম নেই। যারা প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত নয়, তারাই সহায়তা পাচ্ছে।” একই কথা জানাইলেন ঙাফাখুম পাড়া বাসিন্দা উচয়ই মারমা,অংচিং মারমা, টমাস ত্রিপুরা। তারা বলেন বন্যা আমাদেরসহ প্রায় ১২ পরিবারের ঘরবাড়ী ডুবিয়ে গেছে, কিন্তু আমরা এখনও সহায়তা পাই নাই। আমরা অনেক কষ্টে দিনাতিপাত করছি।
বিজ্ঞাপন

মোঃ ইউছুপ বলেন, “জনপ্রতিনিধিদের বাদ দিয়ে তালিকা প্রস্তুত করলে সাধারণ মানুষের আস্থা নষ্ট হয়।”
ত্রাণ বিতরণ শেষে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান থানজামা লুসাইয়ের প্রতিনিধি ও জেলা পরিষদের সদস্য খামলাই ম্রো বলেন, “জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে ৬২৫ জন ক্ষতিগ্রস্তকে ২৫ কেজি করে চাল দেওয়ার ঘোষণা ছিল। তবে পরিস্থিতির কারণে ২০ কেজি করে চাল এবং উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২ কেজি করে আলু বিতরণ করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন

প্রশাসন জানিয়েছিল, জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। কিন্তু আমার কাছে যে তালিকা এসেছে, তাতে কোনো ইউপি চেয়ারম্যান, সদস্য, সংরক্ষিত সদস্য কিংবা কারবারির স্বাক্ষর নেই। তাদেরকে সম্পৃক্ত করা হলে, তাদের স্বাক্ষর থাকলে তালিকাটি আরও গ্রহণযোগ্য হতো এবং প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সুযোগ বাড়ত।”
একই বক্তব্য দেন তিন্দু ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ভাগ্য চন্দ্র ত্রিপুরা। তিনি বলেন,”জনপ্রতিনিধিরা জনগনের কাছে সর্বদা দায়বদ্ধ থাকেন। সুতার দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা প্রনয়নের ক্ষেত্রে জনপ্রতিনিধিদেরকে সম্পৃক্ত করা না হওয়ায় ত্রাণ বিতরণে সমতা আসে নাই।”
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মসফিকুর রহমান বলেন, “আমি ঊর্ধ্বতন প্রশাসনের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করি। এবার প্রায় ২০০ পরিবারের একটি ক্ষতিগ্রস্তের তালিকা রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মাধ্যমে আমাদের হাতে এসেছে। তবে পাহাড়ধস ও কৃষি খাতের ক্ষয়ক্ষতির তালিকায় প্রায় দুই হাজার ক্ষতিগ্রস্তের তথ্য রয়েছে।”
বিজ্ঞাপন

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মোঃ ওয়াহিদ হোসেন জানান, “উপজেলায় ৪টি ইউনিয়নের মোট ২৩ দশমিক ৭৭ হেক্টর উচু নিচু জমিতে পাহাড় ধসে ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রোপা আউশ, গ্রীষ্মকালীন সবজি, ফলবাগান, আদা চাষ, হলুদ চাষ, পাহাড়ি ফলবাগানসহ মোট ১০৬৫ পরিবার ক্ষতিগ্রস্থদের তালিকা প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। সরকারি প্রণোদনা বা পুনর্বাসন সহায়তা পাওয়া গেলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মধ্যে তা তুলে দেয়া হবে।”
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল-ফয়সালের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোন বন্ধ থাকায় তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বিএনকেএস উপ পরিচালক উবানু মারমা বলেন, “আমাদের নিজস্ব কর্মী দিয়ে ক্ষতিগ্রস্থদের বাড়ীতে গিয়ে তালিকা প্রস্তুত করা হয়। তালিকায় সংশ্লিষ্ঠ গ্রামের প্রধান (কারবারী) ওয়ার্ডে মেম্বার, সংরক্ষিত নারী মেম্বার এবং ইউপি চেয়ারম্যানের স্বাক্ষরিত তালিকা প্রশাসনিক কর্মকর্তার সাথে সমন্বয় ও এ্যাডভোকেসি করে সহায়তা দেয়া হবে।”
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা প্রশাসন ও জেলা পরিষদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবের কারণেই এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। নিরপেক্ষ তদন্ত, ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা পুনর্বিবেচনা এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে ত্রাণ সহায়তা দেয়ার আহবান জানান।
নিজস্ব সংবাদদাতা 




















