
পার্বত্য খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলায় উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপিত হচ্ছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা।
এ বছর উপজেলার ১১টি পূজামণ্ডপে চলছে দেবীর আরাধনা। ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি ও উলুধ্বনিতে মুখর হয়ে উঠেছে জনপদ। পূজাকে ঘিরে ভক্তদের পদচারণায় প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে মণ্ডপগুলো। অন্যদিকে, উৎসব নির্বিঘ্ন ও শান্তিপূর্ণ রাখতে ড্রোন নজরদারিসহ চার স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করেছে প্রশাসন। বিজিবি ও সেনাবাহিনীর টহল এবং নজরদারিও জোরদার করা হয়েছে।
উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর পূজার সার্বিক পরিস্থিতি ভালো রয়েছে। সরকারি আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি পূজামণ্ডপগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সমন্বিতভাবে কাজ করছে। পুলিশ, আনসার-ভিডিপি ও অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থার সমন্বয়ে চার স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মণ্ডপগুলোতে নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েনের পাশাপাশি সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
এদিকে, পাহাড়ি জনপদে শান্তি-সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং পূজার সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ তৎপরতা চালাচ্ছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। পানছড়ি ব্যাটালিয়ন (৩ বিজিবি) ও লোগাং জোনের উদ্যোগে নিয়মিত টহলের পাশাপাশি বিশেষ টহল পরিচালনা করা হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ও পূজামণ্ডপের আশপাশে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি ড্রোনের মাধ্যমে আকাশপথে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বিজিবির সদস্যরা বিভিন্ন পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করে নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যালোচনা করছেন।
পানছড়ি ব্যাটালিয়ন (৩ বিজিবি) অধিনায়ক ও লোগাং জোনের জোন কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ রবিউল ইসলাম, পিপিএম (সেবা) বিভিন্ন পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলছেন এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতির খোঁজখবর নিচ্ছেন। এর আগে সম্প্রীতির বন্ধন সুদৃঢ় করতে ৩ বিজিবির পক্ষ থেকে পানছড়ি ও লোগাং এলাকার ছয়টি পূজামণ্ডপে আর্থিক অনুদান দেওয়া হয়। অনুদানপ্রাপ্ত মণ্ডপগুলো হলো—পানছড়ি বাজার কেন্দ্রীয় দেবালয়, আদি ত্রিপুরা পাড়া মন্দির, সাঁওতাল পাড়া লোকনাথ সেবাশ্রম, লোগাং হেডম্যান পাড়া দুর্গামন্দির, লোগাং বাজার বিগ্রহ মন্দির ও অষ্টমঙ্গলা শিব মন্দির।
বিজিবির পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে সেনাবাহিনীর টহল ও নজরদারিও নিরাপত্তাব্যবস্থাকে আরও জোরদার করেছে। পূজাকে কেন্দ্র করে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও আশপাশের এলাকায় টহল এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে নিরাপত্তা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। প্রশাসন, বিজিবি, সেনাবাহিনী, পুলিশ ও স্থানীয় পূজা উদযাপন কমিটির সমন্বিত উদ্যোগে উৎসবকে নির্বিঘ্ন রাখার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
এ বছর পানছড়ির দুর্গাপূজায় বাড়তি আকর্ষণ যোগ করেছে বড় সাঁওতালপাড়ার সাঁওতাল সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী ‘দাসাই’ নাচ। ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও বাদ্যযন্ত্র নিয়ে সাঁওতাল তরুণেরা বিভিন্ন পূজামণ্ডপে ঘুরে ঘুরে এ নাচ পরিবেশন করছেন। তাঁদের পরিবেশনায় উৎসবের আমেজ আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে। আয়োজকেরা জানান, নাচের মাধ্যমে পাওয়া উপহারসামগ্রী দিয়ে বিজয়া দশমীর পর সর্বজনীন খিচুড়ি উৎসবের আয়োজন করা হবে।
পানছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারহানা নাসরিন জানান, দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করাসহ প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় পূজা উদযাপন কমিটির মধ্যে সমন্বয় রেখে কাজ করা হচ্ছে।
এ বছর পানছড়ি উপজেলার ১১টি পূজামণ্ডপ হলো—পানছড়ি বাজার কেন্দ্রীয় দেবালয়, আদি ত্রিপুরা কালিমন্দির, সাঁওতালপাড়া লোকনাথ সেবাশ্রম দুর্গামন্দির, কুড়াদিয়াছড়া দুর্গা শ্রীশ্রী মন্দির, লোগাং বাজার অষ্টমঙ্গলা দুর্গামন্দির, বাউরাপাড়া দুর্গামন্দির, বৈশাখ কুমারপাড়া শ্রীশ্রী দুর্গামন্দির, বাঁশপাড়া দেবালয় মন্দির, মরাটিলা সার্বজনীন শিবমন্দির, লোগাং বাজার বিগ্রহ কালীমন্দির এবং লোগাং হেডম্যানপাড়া দুর্গামন্দির।
পূজা উদযাপন কমিটির নেতৃবৃন্দ জানান, প্রশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনীর তৎপরতায় ভক্তরা স্বস্তির সঙ্গে পূজার আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নিচ্ছেন। ধর্মীয় সম্প্রীতি, পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রেখে এবারের দুর্গোৎসব সম্পন্ন হবে বলে আশা করছেন তাঁরা।
পাহাড়ি জনপদ পানছড়িতে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের অংশগ্রহণ ও ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক পরিবেশনা উৎসবকে দিয়েছে ভিন্নমাত্রা। নিরাপত্তা বাহিনীর নজরদারি এবং স্থানীয় মানুষের পারস্পরিক সহযোগিতায় শারদীয় দুর্গোৎসব হয়ে উঠেছে সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের এক মিলনমেলা।
আরিফুল ইসলাম মহিন, খাগড়াছড়ি : 



















