
বান্দরবানের থানচি উপজেলায় বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের বিহারে ভিক্ষু শ্রমন উপাসক উপাসিকাদের সমন্বয়ে পিন্ড দান, মোমবাতি প্রজ্জলন, ধর্ম দেশনা,ধ্যানসহ (মহা ওয়াগোওয়া পোওয়ে) শুভ প্রবারণা পূর্ণিমা শুরু। বৌদ্ধ বিহারেগুলোতে উদসব উদ্যাপনের লক্ষ্যে ৮৩ টি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বরাদ্ধকৃত চাউল ঘুরে টাকা পরিনত হওয়ার পর, ২ বৌদ্ধ বিহার ও ২টি শারদীয় দুর্গা মন্দির পেল পরিপুর্ন বরাদ্দ। কিন্তু বাকি ৭৯টি বৌদ্ধ বিহার ও ক্রামা ধর্মালম্বিরা পেল ৮০%।
খাদ্য গুদাম ও খাদ্য নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তার দীর্ঘদিন উপজেলা সদরে অনুপস্থিতির সুযোগে প্রশাসন, মন্ত্রীর প্রতিনিধি ও জনপ্রতিনিধিদের একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কৃত্রিম সংকট ও নানা অজুহাত সৃষ্টি করে বৌদ্ধ বিহার পরিচালনা কমিটিগুলোকে বরাদ্দের চাল বিক্রি করতে বাধ্য করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট বৌদ্ধ বিহার পরিচালনা কমিটিগুলোর মধ্যে তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে।
উপজেলা ত্রাণ পুর্নবাসন কার্যালয় সুত্রে জানা গেছে, প্রতি বছরের ন্যায় ত্রাণ ও পুর্নবাসন অধিদপ্তর এবং মন্ত্রনালয়, উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে উপজেলা ৪টি ইউনিয়নের ৮১টি বৌদ্ধ বিহার এবং ২টি শারর্দীয় দুর্গা মন্দির নিয়ে মোট ৮৩টি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের উৎসব উদযাপনের জন্য ৬০০ কেজি করে ৪৯.৮০০ মে: টন চাউল বরাদ্ধ দেন।
বরাদ্ধকৃত চাউলের ডেলিভারী আদেশ ( ডিও) মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) দুপুরে উপজেলা পরিষদের মিলনায়তনে আনুষ্ঠানিকভাবে সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের নিকট হস্তান্তর করেন।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা কার্যালয়ের অফিস সহকারী মো: সরিফুল ও রুবেল জানান, ডিও বিতরণ কালে রেমাক্রী ইউপি চেয়ারম্যান মুইশৈথুই মারমা রনি, রেমাক্রী তিন্দু ইউনিয়নের জন্য ৩৪ টি মাননীয় মন্ত্রীর প্রতিনিধি মংশৈম্রাই মারমা থানচি বলীপাড়া ইউনিয়নের ৪৫টি মোট ৭৯টি ডেলিভারী আদেশের (ডিও) কাগজ ডিলারের নিকট বিক্রি করে, টাকা রুপান্তরের জন্য আমাদের নিকট থেকে প্রভাব খাটিয়ে নিয়ে গেছে।বাকি ৪টি মৈত্রী শিশু সদন ভান্তে , করুনা শিশু সদনের ভান্তে ও শারদীয় দুর্গা মন্দিরে সরাসরি ডিও লেটার কাগজ নিয়ে গেছে।
বিহার পরিচালনা কমিটি সদস্যরা জানান, উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয় ও খাদ্য গুদামের কর্মকর্তা এলাকায় উপস্থিত থাকলে সরাসরি বরাদ্ধকৃত চাউল নিজ নিজ উদ্যোগের উক্তোলন করা সম্ভব হতো। ডিও লেটার বিতরণের দিন হতে এই প্রতিবেদন লিখার আগ পর্যন্ত খাদ্য নিয়ন্ত্রণ ও খাদ্য গুদামের কর্মকর্তা কর্মচারীদের পাওয়া যায় নি।
মুঠোফোনের যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও খাদ্য গুদামে ম্যানেজার মো: ইসমাইলের 01877250601 নম্বরে গত তিনদিন ধরে সংযোগ পাওযা যায়নি।
ডিও বিতরনের সময় স্বশরীরে উপস্থিত হয়ে রেমাক্রী ইউনিয়নের ক্যবুপাড়া বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ উ: অগ্রবংশ ভিক্ষু, রেমাক্রী বাজার বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ উ: সুচিত্ত্বা মহাথেরো, কোয়াইক্ষ্যং পাড়া বিহারের অধ্যক্ষ উ: পয়ঞাজতা ভিক্ষু জানান, ওসি এলএসডি ও খাদ্য নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা উপস্থিত না থাকায় কৃতিম সংকট ও সিন্ডিকেট তৈরী করে রেখেছেন সংশ্লিষ্ঠরা। উপায় না পেয়ে রেমাক্রী ইউপি চেয়ারম্যান ও মন্ত্রী প্রতিনিধি আমাদের বলেন, ‘ডিও বিক্রি করে ৬০০ কেজি বাবৎ ২১ হাজার ৬০০ টাকা পেয়েছি। প্রতি বিহার থেকে প্রশাসনিক অফিস খরচ ১ হাজার, উপজেলা ভিক্তিক যুব সম্প্রদায়ের প্রবারনা উৎসব উদযাপন কমিটি জন্য দেড় হাজার মোট আড়াই হাজার টাকা রেখে দিয়েছি। আমরা ৭৯টি ডিও গ্রহনকারীরা সর্বসম্মতি দিয়েছি। বাকি ১৯ হাজার ১ শ্ টাকা থেকে আমাদেরকে ১৫ হাজার টাকা দিয়ে বিদায় দিয়েছে। আমরা শুনেছি ও প্রত্যক্ষ করেছি রেমাক্রী ইউপি চেয়ারম্যান মুইশৈথু মারমা রনি ২০১৬ সাল থেকে ২০২৫ পর্যন্ত সরকারী বরাদ্ধের কথা; কিন্তু আমাদের নিকট রেমাক্রী ইউপি চেযারম্যান নিজের পকেট থেকে ৫ হাজার টাকা করে দান করেন বলে জানিয়েছিল। এসব আমরা সরকারী অনুদান বলে জানতাম না।’
জানতে চাইলে থানচি প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মশফিকুর রহমান বলেন, ‘৪ ইউপি চেয়ারম্যান স্বাক্ষর করে ২০২৬ সালে উপজেলা বৌদ্ধ ভিক্ষু,উপাসক উপাসিকা আছে এমন বৌদ্ধ বিহার তালিকা ১২০ টা জমা দিয়েছিল। প্রাথমিক যাচাই-বাছাই এবং গোয়েন্দা সংস্থার আপত্তির কারনে ৮১ টি বৌদ্ধ বিহার ২টি শারদীয় দুর্গা মন্দিরের ৬০০ কেজি করে বরাদ্দ দিয়েছি। ইউপি চেয়ারম্যান, মন্ত্রী প্রতিনিধিদের মাধ্যমে তাদের উপস্থিতিতে বৌদ্ধ বিহারের পরিচালনা কমিটি সভাপতি সম্পাদক হাজির করে উপজেলা পরিষদের হল রুমে অনুষ্ঠানিকভাবে ডেলিভারী আদেশের (ডিও) কাগজ হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। পরে কি করল আমরা জানি না। তবে অফিস খরচ ১ হাজার টাকা রাখা হয় নি। কর্মচারী রেখে থাকলে ফেরত দেয়া হবে। যারা কম পেয়েছেন অভিযোগ পেলে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।’
তালিকানুসারে সরেজমিনে গিয়ে দেখি, রেমাক্রী ইউনিযনের চাইহ্লাউ পাড়া,ক্রাহ্লাঅং পাড়া ও বেশ কয়েকটি গ্রামে মারমা সম্প্রদায়ের গ্রাম আছে বৌদ্ধ (বিহার ক্যাংঘর) নেই, তিন্দু ইউনিয়নের সাউপ্রু পাড়া, ওয়েলাওয়া পাড়া, ছাংওডং পাড়াসহ বেশ কয়েকটি গ্রামে মারমা সম্প্রদায়ের গ্রাম রয়েছে বৌদ্ধ বিহার বা ভিক্ষু নেই।
যোগাযোগ করা হলে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী রাজপুত্র সাচিংপ্রু জেরী এর প্রতিনিধি মংশৈম্রাই মারমা বলেন, ‘আমি ৪৫টা ডিও লেটার পিআইও কার্যালয় হতে নিয়েছি। এগুলো প্রতিকেজি ৩৬ টাকা করে বিক্রি করেছি। আমি স্বশরীরে প্রতিটি বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ এর নিকট ১৯ হাজার টাকা পৌঁছে দিয়েছি। টাকা খুচরা না থাকায় ১ শ্ টাকা কম দিয়েছি।’
যোগাযোগ রা হলে বান্দরবানের ডিলার আলী হোসেন জানান, ‘আমার ড্রাইভার প্রতি কেজিতে ৩৭ টাকা হারে প্রতি বিহারের ২২ হাজার ২ শ্ টাকা মাননীয় মন্ত্রীর প্রতিনিধি ও রেমাক্রী চেয়ারম্যানের হাতে ৬৯টি বৌদ্ধ বিহারে ১৫ লাখ ৩১ হাজার, ৮ শ্ টাকা বুঝিয়ে দিয়েছি।’
এদিকে থানচি সদর ইউনিয়নের জিনিঅং পাড়া বৌদ্ধ বিহারে অধ্যক্ষ উ. কাওয়িদা ভিক্ষু জানান ‘আমাকে শুধু মাত্র ৭ হাজার টাকা দিয়েছে। সরকার কত দিয়েছে আমি জানি না।’
নারিকেল পাড়া বৌদ্ধ বিহারে অধ্যক্ষ উ: চাইন্দিমা ভিক্ষু জানান, আমি গত ৫ বছর যাবৎ সরকারের প্রদত্ত টাকা পাইনি বর্তমানে ও পাইনি।’
যোগাযোগ করা হলে পার্বত্য ভিক্ষু পরিষদের থানচি শাখা সভাপতি থানচি হেডম্যান পাড়া বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ উ: ইউসারাদা মহাথেরো বলেন, ‘আমি চলতি বছরে ১৯ হাজার টাকা পেয়েছি, আমাদের উপজেলা বৌদ্ধ ভিক্ষু সংঘ, শ্রমন উপাসক উপাসিকাসহ বৌদ্ধ বিহার রয়েছে মোট ৩৭টি। বাকি বৌদ্ধ বিহার গুলির বিষয়ে আমরা জানি না।’
স্থানীয় বৌদ্ধ সম্প্রদায়রা জানান, চেয়ারম্যান মেম্বারা অত্র উপজেলার ১২০টা বৌদ্ধ বিহারের নামের তালিকা তৈরী করেছেন। সরকারী বরাদ্ধ পাওয়ার জন্য বৌদ্ধ সম্প্রদায় গ্রাম আছে বৌদ্ধ বিহার ও ভিক্ষু সংঘ নেই। ক্রামাঘরকে বৌদ্ধ বিহার বলে না। ম্রো সম্প্রদায়রা ক্রামা ক্যংঘর বলে। তারা চৈত্র সংক্রান্ত পালন করেন। কিন্তু প্রবারনা পুর্নিমা পালন করার তেমনটা দেখা যায় না।
থানচি সদর ইউপি চেয়ারম্যান অংপ্রু ম্রো বলেন, ‘সদর ইউনিয়নের ম্রো সম্প্রদায়ের ক্রামা ক্যাংঘর রয়েছে ২৫টি, মারমা সম্প্রদায়ের বৌদ্ধ বিহার রয়েছে ১০টি, মোট ৩৫টি বরাদ্ধ পেয়েছে। ম্রো সম্প্রদায়ের ক্রামা ক্যাংঘর নেই ৬টি আমি মারমা বৌদ্ধ বিহারের টাকা নেইনি মংশৈম্রাই নিয়েছে। ২৫টি ক্রামা ক্যাংঘরের বরাদ্ধ থেকে ৪ হাজার ১ শ্ টাকা কম রেখে অপর ৪টি ক্রামাক্যাংঘর নেই এমন গ্রামে ভাগ করে দিয়েছি। ক্রামা ধর্মালম্বিরা প্রবারনা পুর্নিমা সেপ্টেম্বর মাসের ১৫ তারিখ উদযাপন করা হয়েছে(!)। ২৫ অক্টোবর মারমা সম্প্রদায় প্রবারনা পুর্নিমা উদযাপন করবেন।’
রেমাক্রি ইউপি চেয়ারম্যান মুইশৈথুই মারমা রনি বলেন, আমি কি চাল ব্যবসায়ী নাকি? ডিও এর আশেপাশে ও আমি নাই।’ মন্ত্রীর প্রতিনিধি মংশৈম্রাই ডিও লেটার নিয়েছে বলে দাবী করেন তিনি।
এসব বিষয়ে জানতে লামা উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রণ কার্যালয়ের কর্মকর্তা থানচি ও আলীকদম উপজেলা অতিরিক্ত দাযিত্বে মো: জহিরুল হক এর মুঠো ফোন 01822099555 এর গত তিনদিন ধরে ফোন করে রিসিভ না করার তার বক্তব্য পাওযা যায় নি।
নিজস্ব সংবাদদাতা, (বান্দরবান)থানচি: 



















