
বান্দরবান জেলা প্রতিনিধি: দুর্গম পাহাড়ে একটি বিদ্যালয় সচল রাখতে ছুটির দিনেও নৌকার হাল ধরেছিলেন প্রধান শিক্ষক। ইঞ্জিনচালিত বোট চালিয়ে পর্যটক ও যাত্রী পরিবহন করে উপার্জন করা অর্থ দিয়ে সহকর্মীদের বেতন-ভাতা পরিশোধের চেষ্টা করতেন তিনি। সেই সংগ্রামের গল্প উঠে আসে সংবাদমাধ্যমে। এরপর বদলে যেতে থাকে পুরো চিত্র।
বান্দরবানের থানচি উপজেলার দুর্গম তিন্দু নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বামং খিয়াং মিংলেন এখন জাতীয়ভাবে সম্মানিত এক শিক্ষক। বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে দেশের ১০২ জন গুণী শিক্ষকের সঙ্গে তাঁকেও সম্মাননা দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর পছন্দের সাতজন শিক্ষকের তালিকায়ও স্থান পেয়েছেন তিনি।
বামং খিয়াং মিংলেনের এই স্বীকৃতির গল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সাংবাদিকতার একটি মানবিক অধ্যায়।
চলতি বছরের ১৩ মে দুর্গম তিন্দু এলাকার বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নানা সমস্যা এবং প্রধান শিক্ষক বামং খিয়াং মিংলেনের অসাধারণ সংগ্রামের কথা তুলে ধরে প্রতিবেদন প্রকাশ করেন জাতীয় দৈনিক প্রতিদিনের বাংলাদেশ ও ঢাকা মেইল-এর বান্দরবান জেলা প্রতিনিধি সাংবাদিক সুফল চাকমা।
প্রতিবেদনে উঠে আসে, বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা নিশ্চিত করতে ছুটির দিনেও বোট চালিয়ে আয় করতেন প্রধান শিক্ষক। নিজের উপার্জনের অর্থ থেকে সহকর্মীদের বেতন দেওয়ার চেষ্টা করতেন তিনি। দুর্গম পাহাড়ে শিক্ষার আলো জ্বালিয়ে রাখতে একজন শিক্ষকের এমন আত্মত্যাগের গল্প নজর কাড়ে দেশজুড়ে।
পরবর্তীতে দেশের বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমে বামং খিয়াং মিংলেনকে নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। বিষয়টি জাতীয় পর্যায়ে আলোচনায় আসে এবং ২৮ জুন মহান জাতীয় সংসদেও আলোচিত হয়।
এরপর আসে বড় পরিবর্তন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় তিন্দু নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ধারাবাহিক প্রক্রিয়া শেষে ১৩ জুলাই ২০২৬ বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের প্রজ্ঞাপন জারি হয়।
এরপর ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবসে আসে আরও বড় সুখবর। জাতীয়ভাবে সম্মানিত ১০২ জন গুণী শিক্ষকের তালিকায় জায়গা করে নেন সেই বামং খিয়াং মিংলেন—যিনি একসময় বিদ্যালয় সচল রাখতে নিজেই নৌকার হাল ধরেছিলেন।
এই পুরো ঘটনায় সাংবাদিকতার ভূমিকা নিয়ে আবেগঘন প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সাংবাদিক সুফল চাকমা।
তিনি বলেন, “দুর্গম তিন্দুর সেই শিক্ষক আজ জাতীয়ভাবে সম্মানিত—সাংবাদিক হিসেবে এটাই আমার এবং সকল সাংবাদিকের লেখনির সার্থকতা।”
সুফল চাকমা বলেন, একজন সাংবাদিক যখন দুর্গম এলাকার মানুষের কথা, শিক্ষা-স্বাস্থ্যসহ নানা সংকটের কথা গণমাধ্যমে তুলে ধরেন, তখন সেই লেখা শুধু একটি সংবাদ হয়ে থাকে না; কখনো কখনো তা মানুষের অধিকার ও সম্ভাবনার কথাও রাষ্ট্রের সামনে তুলে ধরে।
তাঁর ভাষায়, দুর্গম পাহাড়ি এলাকার একটি বিদ্যালয়ের সমস্যা জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরা, নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা এবং শেষ পর্যন্ত সেই সমস্যার সমাধানের পথ তৈরি হওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারা—একজন সাংবাদিকের জন্য এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে!
বামং খিয়াং মিংলেনের জাতীয় সম্মাননায় আনন্দ ও গর্ব প্রকাশ করে সাংবাদিক সুফল চাকমা বলেন, সংগ্রামী এই শিক্ষকের স্বীকৃতি তাঁর নিজের জন্যও এক আনন্দের মুহূর্ত।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, দুর্গম পাহাড়ের শিক্ষার আলো জ্বালিয়ে রাখতে বামং খিয়াং মিংলেনের এই নিরলস প্রচেষ্টা ভবিষ্যতে আরও অনেক শিক্ষক ও মানুষকে অনুপ্রাণিত করবে।
তিন্দুর সেই দুর্গম বিদ্যালয়, এক শিক্ষকের আত্মত্যাগ আর একজন সাংবাদিকের কলম সব মিলিয়ে এটি যেন প্রমাণ করে, একটি সংবাদ কখনো কখনো শুধু খবর থাকে না; একটি পরিবর্তনের সূচনাও করতে পারে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 




















