Lama ০৮:০১ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গাইবান্ধায় চার মাসেই নদীতে বিলীন জেলা পরিষদের কাঠের সেতু, প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ঘুষের অভিযোগ

জনদুর্ভোগ লাঘবের নামে সরকারের প্রায় ৭ লাখ টাকা জলে ফেলে দেওয়ার এক নজিরবিহীন ঘটনা ঘটেছে গাইবান্ধায়। সদর উপজেলার বানিয়ারজান এলাকায় আলাই নদীর ওপর নির্মিত জেলা পরিষদের কাঠের সেতুটি উদ্বোধনের মাত্র চার মাসের মাথায় ভেঙে পড়ে কচুরিপানার নিচে তলিয়ে গেছে। নির্মাণে চরম অনিয়ম, নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার এবং দায়িত্বশীলদের যোগসাজশে হরিলুটের কারণেই সামান্য পানির তোড়েই সেতুটির এমন করুণ পরিণতি হয়েছে বলে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এলাকাবাসী।

​সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, আলাই নদী ও গাইবান্ধা পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বানিয়ারজান সীমানায় নির্মিত সেতুটি বর্তমানে পুরোপুরি বিধ্বস্ত। ভেঙে পড়া কাঠ ও বাঁশের অবকাঠামো কচুরিপানায় আটকে আছে, যার ফলে দুই পাড়ের মানুষের যাতায়াত পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

​স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বানিয়ারজান ও বোয়ালী এলাকার কয়েক হাজার মানুষের পৌর শহরে যাতায়াতের একমাত্র ভরসা ছিল একটি নড়বড়ে বাঁশের সাঁকো। স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে জেলা পরিষদ সেখানে একটি রেলিংযুক্ত কাঠের সেতু নির্মাণের জন্য প্রায় ৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়। কিন্তু সেই প্রত্যাশা এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, কাজ চলাকালীনই অনিয়মের প্রতিবাদ করা হলেও তা কানে তোলেননি সংশ্লিষ্টরা।

​বানিয়ারজান এলাকার বাসিন্দা আরিফ ও রিপন মিয়া ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, “শুরু থেকেই কাজের মান ছিল অত্যন্ত নিম্নমানের। খুঁটি যথেষ্ট গভীরে পোঁতা হয়নি। ৭ লাখ টাকার বরাদ্দে বড়জোর আড়াই থেকে তিন লাখ টাকার কাজ করে বাকি টাকা ভাগাভাগি করা হয়েছে। আমরা যখন অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলাম, তখন জেলা পরিষদের প্রকৌশলী হারুনকে ঠিকাদার আড়ালে নিয়ে যান। ঘুষের বিনিময়ে এমন নড়বড়ে কাজের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এই হরিলুটের মূল কারিগর প্রকৌশলী হারুন; সরকারের রাজস্ব গচ্চা যাওয়ার সম্পূর্ণ দায় তারই।”

​বোয়ালী ইউনিয়নের বাসিন্দা শ্রী সুমল দাস বলেন, “নদীতে এমন কোনো তীব্র স্রোত ছিল না। কাজ শেষ হওয়ার এক মাস পার হতেই সেতুটি একদিকে হেলে পড়ে। আর সাড়ে তিন মাস যেতে না যেতেই ধসে পড়ে নদীতে তলিয়ে যায়। এখন আমরা চরম বিপাকে পড়েছি।”

​অভিযোগ রয়েছে, মূল লাইসেন্সধারী ঠিকাদার নিজে কাজ না করে অন্যকে দিয়ে কাজ করিয়েছেন। ফলে কোনো ধরনের প্রকৌশলগত মান বজায় রাখা হয়নি। অথচ প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা রহস্যজনকভাবে সেই কাজ বুঝে নিয়েছেন। এ বিষয়ে জেলা পরিষদের প্রকৌশলী হারুনের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো সদুত্তর না দিয়ে বলেন, “অফিসে আসেন, কথা হবে”— বলেই সংযোগ কেটে দেন।

​অন্যদিকে জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বিপুল চন্দ্র দাস দায় এড়িয়ে দাবি করেন, “কচুরিপানা ও স্রোতের কারণেই সেতুটি ভেঙে পড়েছে। আগামী শুষ্ক মৌসুমে এটি পুনরায় নির্মাণ করা হবে।”

​তবে কর্মকর্তাদের এমন দায়সারা বক্তব্যে ক্ষোভের আগুন আরও ছড়িয়েছে। স্থানীয় সচেতন মহলের প্রশ্ন—নদীর স্বাভাবিক স্রোত ও কচুরিপানার চাপ সামলানোর ন্যূনতম সক্ষমতা কেন সেতুটির ছিল না? দায়ীদের পকেট ভারী করতে গিয়ে জনগণের করের টাকার এই প্রকাশ্য অপচয় এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করে প্রকৌশলী ও ঠিকাদারের বিরুদ্ধে দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

Popular Post

লামায় রূপসীপাড়া ইউনিয়নে ক্রাশ প্রোগ্রামের আওতায় ম্রো শিশুদের টিকাদান

Bandarban Tribune

গাইবান্ধায় চার মাসেই নদীতে বিলীন জেলা পরিষদের কাঠের সেতু, প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ঘুষের অভিযোগ

Update Time : ০২:৫৩:৩১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জনদুর্ভোগ লাঘবের নামে সরকারের প্রায় ৭ লাখ টাকা জলে ফেলে দেওয়ার এক নজিরবিহীন ঘটনা ঘটেছে গাইবান্ধায়। সদর উপজেলার বানিয়ারজান এলাকায় আলাই নদীর ওপর নির্মিত জেলা পরিষদের কাঠের সেতুটি উদ্বোধনের মাত্র চার মাসের মাথায় ভেঙে পড়ে কচুরিপানার নিচে তলিয়ে গেছে। নির্মাণে চরম অনিয়ম, নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার এবং দায়িত্বশীলদের যোগসাজশে হরিলুটের কারণেই সামান্য পানির তোড়েই সেতুটির এমন করুণ পরিণতি হয়েছে বলে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এলাকাবাসী।

​সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, আলাই নদী ও গাইবান্ধা পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বানিয়ারজান সীমানায় নির্মিত সেতুটি বর্তমানে পুরোপুরি বিধ্বস্ত। ভেঙে পড়া কাঠ ও বাঁশের অবকাঠামো কচুরিপানায় আটকে আছে, যার ফলে দুই পাড়ের মানুষের যাতায়াত পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

​স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বানিয়ারজান ও বোয়ালী এলাকার কয়েক হাজার মানুষের পৌর শহরে যাতায়াতের একমাত্র ভরসা ছিল একটি নড়বড়ে বাঁশের সাঁকো। স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে জেলা পরিষদ সেখানে একটি রেলিংযুক্ত কাঠের সেতু নির্মাণের জন্য প্রায় ৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়। কিন্তু সেই প্রত্যাশা এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, কাজ চলাকালীনই অনিয়মের প্রতিবাদ করা হলেও তা কানে তোলেননি সংশ্লিষ্টরা।

​বানিয়ারজান এলাকার বাসিন্দা আরিফ ও রিপন মিয়া ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, “শুরু থেকেই কাজের মান ছিল অত্যন্ত নিম্নমানের। খুঁটি যথেষ্ট গভীরে পোঁতা হয়নি। ৭ লাখ টাকার বরাদ্দে বড়জোর আড়াই থেকে তিন লাখ টাকার কাজ করে বাকি টাকা ভাগাভাগি করা হয়েছে। আমরা যখন অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলাম, তখন জেলা পরিষদের প্রকৌশলী হারুনকে ঠিকাদার আড়ালে নিয়ে যান। ঘুষের বিনিময়ে এমন নড়বড়ে কাজের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এই হরিলুটের মূল কারিগর প্রকৌশলী হারুন; সরকারের রাজস্ব গচ্চা যাওয়ার সম্পূর্ণ দায় তারই।”

​বোয়ালী ইউনিয়নের বাসিন্দা শ্রী সুমল দাস বলেন, “নদীতে এমন কোনো তীব্র স্রোত ছিল না। কাজ শেষ হওয়ার এক মাস পার হতেই সেতুটি একদিকে হেলে পড়ে। আর সাড়ে তিন মাস যেতে না যেতেই ধসে পড়ে নদীতে তলিয়ে যায়। এখন আমরা চরম বিপাকে পড়েছি।”

​অভিযোগ রয়েছে, মূল লাইসেন্সধারী ঠিকাদার নিজে কাজ না করে অন্যকে দিয়ে কাজ করিয়েছেন। ফলে কোনো ধরনের প্রকৌশলগত মান বজায় রাখা হয়নি। অথচ প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা রহস্যজনকভাবে সেই কাজ বুঝে নিয়েছেন। এ বিষয়ে জেলা পরিষদের প্রকৌশলী হারুনের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো সদুত্তর না দিয়ে বলেন, “অফিসে আসেন, কথা হবে”— বলেই সংযোগ কেটে দেন।

​অন্যদিকে জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বিপুল চন্দ্র দাস দায় এড়িয়ে দাবি করেন, “কচুরিপানা ও স্রোতের কারণেই সেতুটি ভেঙে পড়েছে। আগামী শুষ্ক মৌসুমে এটি পুনরায় নির্মাণ করা হবে।”

​তবে কর্মকর্তাদের এমন দায়সারা বক্তব্যে ক্ষোভের আগুন আরও ছড়িয়েছে। স্থানীয় সচেতন মহলের প্রশ্ন—নদীর স্বাভাবিক স্রোত ও কচুরিপানার চাপ সামলানোর ন্যূনতম সক্ষমতা কেন সেতুটির ছিল না? দায়ীদের পকেট ভারী করতে গিয়ে জনগণের করের টাকার এই প্রকাশ্য অপচয় এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করে প্রকৌশলী ও ঠিকাদারের বিরুদ্ধে দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।