
অভিযো উঠেছে বন সম্পদ রক্ষা ও অবৈধ কাঠ পাচার প্রতিরোধ কার্যক্রমকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত পেছনে বর্তমান ডিএফও মোস্তাফিজুর রহমান। এই কর্মকর্তার ভূমিকা সম্পর্কে জনমনে সন্দেহ ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, কোন অবৈধ গাড়ি বিজ্ঞ আদালত হইতে জামিনের প্রার্থনা করলে, বন বিভাগ জামিন না দেওয়ার জন্য আবেদন করেন। কিন্তু এই সকল গাড়ি সমূহ জামিনের সময় বন বিভাগ হতে বিধি মোতাবেক কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় নি। একদিকে বন বিভাগ তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যার্থ। অন্যদিকে তাদেরকে অবৈধ কাঠ পরিবহনকারী গাড়ি জব্দ করে দেওয়ার পরও ঘুষ বানিজ্যের মাধ্যমে গাড়িগুলো সু-কৌশলে ছেড়ে দিচ্ছে।
এই সিন্ডিকেটের দুর্নীতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যা অতীতের ডিএফও ওসমান গনিকেও হার মানিয়েছে। এই সকল বিষয়ে একাধিক বার অভিযোগ পাঠানোর পরেও তাদের বিরুদ্ধে অদ্যাবধি কোন ব্যাবস্থা গ্রহণ করা হয় নি। কোনো এক অদৃশ্য শক্তি সব সময় তাকে এই সকল কাজে সুরক্ষা দিয়ে আসছে।
সিএফ মিহির কুমার দে কে একাধিকবার বিগত ০৫ই আগষ্ট এর পূর্বের ঘটনা এবং ডিএফওর বিভিন্ন অনিয়ম ও দূর্ণতির বিষয়ে তদন্ত করার জন্য লিখিত ও মৌখিক ভাবে অভিযোগ করা সত্ত্বেও তিনি কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেন নাই। এমনকি এসব বিষয়ে অভিযোগ গুলো ছুড়ে ফেলে দিয়েছেন।
ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির বন-বাগানের গাছ ক্রয়-বিক্রয় ও পরিবহনের জন্য অনুমতিপত্র বা জোত পারমিট দেয় বন বিভাগ। চলতি অর্থবছরে প্রায় ১ লাখ ৬৭ হাজার ঘনফুট কাঠের জোত পারমিট দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, প্রতি ঘনফুটে ৭০ টাকা করে মাত্র ৬ মাসেই প্রায় ১ কোটি টাকার বেশি ঘুষ আদায় করেন ডিএফও এবং সিএফ এর এই সিন্ডিকেট। সিএফ মিহির কুমার দে এর প্রত্যক্ষ সুরক্ষায় ডিএফও মোস্তাফিজুর রহমান এবং তাহার সহযোগী সিন্ডিকেট পরিকল্পিতভাবে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষ বাণিজ্যের মাধ্যমে বনজ সম্পদ লুটপাট করে আসতেছে।
বিশেষভাবে যেসব জোতে প্রকৃতপক্ষে আনুমানিক ৩ হাজার হইতে ৫ হাজার সিএফটি গাছ বিদ্যমান থাকে, সেখানে অসাধু উদ্দেশ্যে ২০ হাজার সিএফটি গাছের অনুমোদন প্রদান করা হয়। উক্ত অতিরিক্ত অনুমোদনের বিনিময়ে সংশ্লিষ্ট জোত মালিক ও কাঠ ব্যবসায়ীদের নিকট হইতে বিভিন্ন ধাপে বিপুল অঙ্কের অবৈধ অর্থ আদায় করা হয়। গাছ খাড়া মাকিং-এর সময় প্রতি সিএফটি ৪০ টাকা ৫০ পয়সা হারে ২০ হাজার সিএফটির জন্য আনুমানিক ৮,১০,০০০/- টাকা ঘুষ গ্রহণ করা হয়।
পরবর্তীতে একই গাছ কাটার পর টুকরো করে সাইজ লিস্ট প্রস্তুতের সময় পুনরায় সমপরিমাণ আরও ৮,১০,০০০/- টাকা অবৈধভাবে আদায় করা হয়। অর্থাৎ একটি জোত হতে প্রায় ১৬ লক্ষ টাকার অধিক ঘুষ গ্রহণ করা হয়। শুধু তাই নয়; গাছসমূহ টিপি (TP) করার সময় অতিরিক্ত ৪,৫০০/- টাকা আদায় করা হয় এবং কাঠ গাড়িতে লোড দেওয়ার পর “লোডিং পয়েন্ট চেক” ও “স্টেশন চেক” বাবদ প্রতি ট্রাক হতে আরও ১০,০০০/- টাকা করে ঘুষ আদায় করা হয়।
পরবর্তীতে কাঠ বোঝাই ট্রাক ঢাকা অভিমুখে রওয়ানা দিলে পথিমধ্যে বিভিন্ন স্থানে সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের সদস্যগণ চাঁদা ও ঘুষ গ্রহণ করে তথাকথিত সিল প্রদান করে। যেমন: চকরিয়া নরভিলায় ৩,০০০/- টাকা, পদুয়ায় ৩,২০০/- টাকা, পটিয়া বাইপাস রোডে ১,৬০০/- টাকা, চট্টগ্রামের নতুন ব্রিজ এলাকায় “নর্থ” ও “সাউথ” নামীয় বিশেষ টহল বাহিনীর মাধ্যমে মোট ২,২০০/- টাকা, ধুমঘাট এলাকায় ৩,৮০০/- টাকা, কুমিল্লা সুভাকাজী গেইটে ৩,২০০/- টাকা এবং ঢাকা সোনারগাঁ এলাকায় ৩,৮০০/- টাকা অবৈধভাবে আদায় করা হয়। ফলশ্রুতিতে মাত্র ৩০০ সিএফটির একটি কাঠবোঝাই ট্রাক হইতেই প্রায় ১,০০,০০০/- (এক লক্ষ) টাকার মতন অবৈধ ঘুষ আদায় করা হয়।
এই অবৈধ অর্থ বাণিজ্য অব্যাহত রাখবার লক্ষ্যে এবং বৃহৎ অঙ্কের ঘুষ গ্রহণের সুবিধার্থে প্রকৃত গাছের পরিমাণ অপেক্ষা কয়েকগুণ অধিক সিএফটি অনুমোদন প্রদান করা হয়। যা রাষ্ট্রীয় বনজ সম্পদ ধ্বংস, দুর্নীতি ও ক্ষমতার ভয়াবহ অপব্যবহারের জঘন্য উদাহরণ। পরিবহনের ক্ষেত্রে প্রতি গাড়ি হতে অতিরিক্ত ৩,০০০/- টাকা করে ঘুষ আদায় করা হয়। উক্ত টাকা তিন ধাপে আদায় করা হয়- (ক) দাখিলা কাটার সময় ১,০০০/- টাকা, (খ) টিপি প্রদানের সময় ১,০০০/- টাকা, (গ) টিপিতে স্বাক্ষরের সময় ১,০০০/- টাকা।

এছাড়াও অভিযোগ রয়েছে যে, চারটি বৈধ টিপির গাড়ির সাথে অতিরিক্ত দুইটি গাড়ি বিনা টিপিতে অবৈধভাবে পার করে দেওয়া হয়। অতীতে লামা বন বিভাগে এ ধরনের প্রকাশ্য ঘুষ বাণিজ্য ও দুর্নীতির নজির ছিল না। বর্তমান ডিএফও মোস্তাফিজুর রহমানের কর্মকাণ্ডে বন বিভাগ কার্যত দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে এবং সরকারি বনজ সম্পদ চরম হুমকির মুখে পড়েছে।
তাছাড়াও বমু খাল ও লামা খাল হতে মাতামুহুরী নদী দিয়ে মৌসুমে লক্ষ লক্ষ টাকা সরকারি রাজস্ব নামমাত্র টিপি দিয়ে গাছ ও বাঁশ পাচার করা হচ্ছে। আলীকদমের মাতামুহুরী নদী দিয়ে আনুমানিক আড়াই লক্ষ বাঁশ পাচার করা হয়। যে খাত হতে সরকার লক্ষ টাকা রাজস্ব পাওয়ার কথা ছিল কিন্তু দুর্ণীতিবাজ সিএফ ও ডিএফও এবং তাদের সিন্ডিকেটের ঘুষ বানিজ্যের কারণে সরকারি বাঁশ বাগান নিলাম দেয়া হচ্ছে না। ফলে এই খাত হতে সরকার প্রচুর রাজস্ব হারাচ্ছে।
অভিযোগে আরো উল্লেখ করা হয়, লামা থেকে প্রতিদিন কমপক্ষে ২০-৩০ টি জ্বালানী কাঠের গাড়ী লাইন ঝিরি হয়ে ইয়াছা এবং পরবর্তীতে চকরিয়া সহ বিভিন্ন জায়গায় যায়। প্রতি গাড়ি হইতে ডিএফও’র সিন্ডিকেট ৭০০-৮০০ টাকা আদায় করে। অন্যদিকে ফাইতং এর সড়ক ব্যবহার করে মাতামুহরী ব্রিজ দিয়ে প্রতিদিন ১০-২০ টি জ্বালানী কাঠের গাড়ী যায়। প্রতি গাড়ি হতে ডিএফও’র সিন্ডিকেট ১২০০-১৫০০ টাকা আদায় করে। এই সকল জ্বালানী কাঠ সমূহ লামা সহ আশপাশের উপজেলা সমূহের বিভিন্ন ইট ভাটায় যায়।
যার ফলে একদিকে অবৈধ ভাবে ইটভাটা পরিচালনার ফলে পরিবেশ দূষণ হচ্ছে অন্যদিকে সংরক্ষিতসহ এলাকার বন উজাড় হচ্ছে।
চলবে……
বান্দরবান ট্রিবিউন ডেস্ক: 



















