Lama ০৩:০৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
পানছড়িতে ফের গোলাগুলি, আতঙ্কে সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষ

জেএসএস-ইউপিডিএফের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংঘাতের অভিযোগ, দুই যুবক অপহরণের দাবি

খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলায় আধিপত্য বিস্তার ও নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) ও ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) প্রসীতপন্থী সশস্ত্র পক্ষগুলোর মধ্যে কয়েক দিন ধরে থেমে থেমে গোলাগুলির অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।

সর্বশেষ রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকেও উপজেলার সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকায় গুলির শব্দ শোনা গেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। এতে দুর্গম পাহাড়ি জনপদে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, গত ৩ সেপ্টেম্বর সকাল থেকে পানছড়ির জগপাড়া, তারাবন ও দুধুকছড়া সীমান্তবর্তী এলাকায় দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। পরদিন ৪ সেপ্টেম্বর ভোরেও এসব এলাকায় থেমে থেমে গুলির শব্দ শোনা যায়।

এরপর ৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা পর্যন্ত পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি বলে স্থানীয়দের দাবি। এরই ধারাবাহিকতায় আজ রোববার সকাল থেকেও বিভিন্ন এলাকায় গোলাগুলির খবর পাওয়া যাচ্ছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য; দীর্ঘদিন ধরে পানছড়ির দুর্গম বিভিন্ন এলাকায় আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে আধিপত্য বিস্তার, চলাচলের পথ ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বিরাজ করছে। সাম্প্রতিক গোলাগুলির ঘটনায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।

আতঙ্কে বাড়িঘর ছাড়ছেন অনেকে সংঘাতপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বেড়েছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, প্রাণভয়ে কয়েকটি এলাকার পরিবার বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়ার চেষ্টা করছে। গৃহপালিত পশুপাখি, বসতবাড়ি ও কৃষিকাজ নিয়েও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন অনেকে।

গোলাগুলির কারণে দুর্গম এলাকার স্বাভাবিক যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা ও কৃষিকাজ ব্যাহত হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন স্থানীয়রা। অনেক পরিবার আতঙ্কে দিনের বেলায়ও স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারছে না।

এদিকে ইউপিডিএফের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, গত শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) তারাবন ও জগপাড়া এলাকায় দুই যুবককে সশস্ত্র সদস্যরা অপহরণ করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে গেছে। তবে অপহৃতদের নাম-পরিচয় এখনো জানা যায়নি।

ইউপিডিএফের দাবিতে আরও বলা হয়েছে, গত ৩ সেপ্টেম্বর থেকে ‘সন্তু গ্রুপের’ সশস্ত্র সদস্যরা তারাবন ও জগপাড়া এলাকায় প্রবেশ করে সশস্ত্র তৎপরতা চালাচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় ওই দুই যুবককে অপহরণ করা হয়েছে বলে সংগঠনটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।

এর আগে ২ সেপ্টেম্বর পঙ্কজয় চাকমা (সুভাগ্য) নামে আরও একজনকে অপহরণ করা হয়েছে বলেও ইউপিডিএফের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

সংঘাতের প্রভাব পড়েছে স্থানীয় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও। স্থানীয়দের দাবি, তারাবন ভাবনা কেন্দ্র ও আশপাশের এলাকায় সশস্ত্র অবস্থানের কারণে দায়ক-দায়িকাদের একটি অংশ সেখানে যাতায়াত করতে পারছেন না।

ভাবনা কেন্দ্রে অবস্থানরত ভিক্ষু ও শ্রামণদের নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। খাদ্য, যোগাযোগ ও নিরাপত্তাজনিত সমস্যায় সেখানে অবস্থানরতদের কষ্টের মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে বলে স্থানীয়দের দাবি।

আদিকল্যাণ ভান্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে এলাকার নীরব ও মানবশূন্য পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বলে জানা গেছে।

এদিকে গোলাগুলির ঘটনায় হতাহত নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন পক্ষের সমর্থক ও সংশ্লিষ্ট সাইবার গ্রুপগুলো থেকে নানা দাবি করা হচ্ছে। তবে এসব দাবির স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য যাচাই সম্ভব হয়নি।

এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকেও সংঘর্ষে হতাহত কিংবা অপহরণের বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য নিশ্চিত করা হয়নি।

পানছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফেরদৌস ওয়াহিদ বলেন, “আমি বিভিন্ন মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পেরেছি। তবে ঘটনাটি কতটুকু সত্য, তা উদঘাটনের চেষ্টা চলছে।”

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের সশস্ত্র সংঘাতের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘাতের পাশাপাশি চাঁদাবাজি, অপহরণসহ বিভিন্ন অভিযোগে দুর্গম পাহাড়ি জনপদে অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ঝুঁকিপূর্ণ ও কৌশলগত এলাকাগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার, নিয়মিত টহল বৃদ্ধি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নিরাপত্তা চৌকি ও সেনা ক্যাম্প স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

তাদের মতে, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘদিনের সশস্ত্র সংঘাত নিরসনে স্থায়ী উদ্যোগ প্রয়োজন। এতে পানছড়িতে স্বাভাবিক জনজীবন ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি পার্বত্য এলাকায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার পথও সুগম হবে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

Popular Post

বাঘাইছড়িতে সৈয়দ নুর মোহাম্মদ শাহ্ (রহ:)-এর ২৬তম ওফাত বার্ষিকী উপলক্ষে ওরশ মোবারক

Bandarban Tribune

পানছড়িতে ফের গোলাগুলি, আতঙ্কে সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষ

জেএসএস-ইউপিডিএফের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংঘাতের অভিযোগ, দুই যুবক অপহরণের দাবি

Update Time : ১০:২৫:৫৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলায় আধিপত্য বিস্তার ও নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) ও ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) প্রসীতপন্থী সশস্ত্র পক্ষগুলোর মধ্যে কয়েক দিন ধরে থেমে থেমে গোলাগুলির অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।

সর্বশেষ রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকেও উপজেলার সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকায় গুলির শব্দ শোনা গেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। এতে দুর্গম পাহাড়ি জনপদে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, গত ৩ সেপ্টেম্বর সকাল থেকে পানছড়ির জগপাড়া, তারাবন ও দুধুকছড়া সীমান্তবর্তী এলাকায় দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। পরদিন ৪ সেপ্টেম্বর ভোরেও এসব এলাকায় থেমে থেমে গুলির শব্দ শোনা যায়।

এরপর ৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা পর্যন্ত পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি বলে স্থানীয়দের দাবি। এরই ধারাবাহিকতায় আজ রোববার সকাল থেকেও বিভিন্ন এলাকায় গোলাগুলির খবর পাওয়া যাচ্ছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য; দীর্ঘদিন ধরে পানছড়ির দুর্গম বিভিন্ন এলাকায় আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে আধিপত্য বিস্তার, চলাচলের পথ ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বিরাজ করছে। সাম্প্রতিক গোলাগুলির ঘটনায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।

আতঙ্কে বাড়িঘর ছাড়ছেন অনেকে সংঘাতপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বেড়েছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, প্রাণভয়ে কয়েকটি এলাকার পরিবার বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়ার চেষ্টা করছে। গৃহপালিত পশুপাখি, বসতবাড়ি ও কৃষিকাজ নিয়েও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন অনেকে।

গোলাগুলির কারণে দুর্গম এলাকার স্বাভাবিক যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা ও কৃষিকাজ ব্যাহত হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন স্থানীয়রা। অনেক পরিবার আতঙ্কে দিনের বেলায়ও স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারছে না।

এদিকে ইউপিডিএফের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, গত শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) তারাবন ও জগপাড়া এলাকায় দুই যুবককে সশস্ত্র সদস্যরা অপহরণ করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে গেছে। তবে অপহৃতদের নাম-পরিচয় এখনো জানা যায়নি।

ইউপিডিএফের দাবিতে আরও বলা হয়েছে, গত ৩ সেপ্টেম্বর থেকে ‘সন্তু গ্রুপের’ সশস্ত্র সদস্যরা তারাবন ও জগপাড়া এলাকায় প্রবেশ করে সশস্ত্র তৎপরতা চালাচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় ওই দুই যুবককে অপহরণ করা হয়েছে বলে সংগঠনটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।

এর আগে ২ সেপ্টেম্বর পঙ্কজয় চাকমা (সুভাগ্য) নামে আরও একজনকে অপহরণ করা হয়েছে বলেও ইউপিডিএফের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

সংঘাতের প্রভাব পড়েছে স্থানীয় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও। স্থানীয়দের দাবি, তারাবন ভাবনা কেন্দ্র ও আশপাশের এলাকায় সশস্ত্র অবস্থানের কারণে দায়ক-দায়িকাদের একটি অংশ সেখানে যাতায়াত করতে পারছেন না।

ভাবনা কেন্দ্রে অবস্থানরত ভিক্ষু ও শ্রামণদের নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। খাদ্য, যোগাযোগ ও নিরাপত্তাজনিত সমস্যায় সেখানে অবস্থানরতদের কষ্টের মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে বলে স্থানীয়দের দাবি।

আদিকল্যাণ ভান্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে এলাকার নীরব ও মানবশূন্য পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বলে জানা গেছে।

এদিকে গোলাগুলির ঘটনায় হতাহত নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন পক্ষের সমর্থক ও সংশ্লিষ্ট সাইবার গ্রুপগুলো থেকে নানা দাবি করা হচ্ছে। তবে এসব দাবির স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য যাচাই সম্ভব হয়নি।

এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকেও সংঘর্ষে হতাহত কিংবা অপহরণের বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য নিশ্চিত করা হয়নি।

পানছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফেরদৌস ওয়াহিদ বলেন, “আমি বিভিন্ন মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পেরেছি। তবে ঘটনাটি কতটুকু সত্য, তা উদঘাটনের চেষ্টা চলছে।”

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের সশস্ত্র সংঘাতের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘাতের পাশাপাশি চাঁদাবাজি, অপহরণসহ বিভিন্ন অভিযোগে দুর্গম পাহাড়ি জনপদে অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ঝুঁকিপূর্ণ ও কৌশলগত এলাকাগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার, নিয়মিত টহল বৃদ্ধি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নিরাপত্তা চৌকি ও সেনা ক্যাম্প স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

তাদের মতে, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘদিনের সশস্ত্র সংঘাত নিরসনে স্থায়ী উদ্যোগ প্রয়োজন। এতে পানছড়িতে স্বাভাবিক জনজীবন ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি পার্বত্য এলাকায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার পথও সুগম হবে।