
ঈদগাঁও (কক্সবাজার) সংবাদদাতা:-
কক্সবাজার জেলার গুরুত্বপূর্ণ ঈদগাঁও বাজারের ইজারা কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ার পরও দায়িত্ব হস্তান্তর করা হচ্ছে না। না করার পেছনে উপজেলার ইউএনও সহ সরকার দলীয় কতিপয় নেতার অবৈধ হস্তক্ষেপ ও কারসাজি রয়েছে বলে জানা গেছে। এ নিয়ে জনগণের মনে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
এদিকে স্থানীয় রাজনৈতিক সিন্ডিকেট ও উপজেলা প্রশাসনের অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ‘খাস কালেকশন’ পদ্ধতি চালু রেখে রাষ্ট্রীয় রাজস্ব লুটপাটের মহোৎসব চলছে।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, ঈদগাঁও বাজারের ৫ম দফা দরপত্রের সরকার নির্ধারিত মূল্য ছিল ৩ কোটি ২৭ লাখ ৭৩ হাজার ৫৬৭ টাকা।
উপজেলা প্রশাসন ও রাজনৈতিক সিন্ডিকেটের অবৈধ হস্তক্ষেপ ও দীর্ঘ সূত্রিতার জটিলতায় চতুর্থবার পর্যন্ত কেউ দরপত্রে অংশগ্রহণ করেনি। পরে এ জটিলতা কাটিয়ে দরপত্রে অংশ নেন উপজেলার পশ্চিম পোকখালীর বাসিন্দা মোঃ আনোয়ার হোসেন। তিনি ৩ কোটি ২৭ লাখ ৭৪ হাজার টাকায় বাজার ইজারা লাভ করেন। ২৫ শতাংশ ভ্যাটসহ সরকারের মোট প্রাপ্য অর্থ দাঁড়ায় প্রায় ৪ কোটি ৭ লাখ ৬৭ হাজার ৫০০ টাকা।
অথচ নিয়ম অনুযায়ী ইজারাদার নিয়োগ হওয়ার পরও রহস্যজনক কারণে দায়িত্ব হস্তান্তর না করে খাস কালেকশন পদ্ধতি টিকিয়ে রাখা হয়েছে। অতীত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় ঈদগাঁও মাছ বাজার, কাঁচা বাজার ,ছাগল বাজার এবং বিভিন্ন ট্রান্সপোর্ট থেকে দৈনিক কালেকশন হত ২৮ থেকে ৩০ হাজার টাকা । বর্তমানে প্রত্যেকদিন শুধু ৩ থেকে ৪ হাজার টাকার নাম মাত্র খাস কালেকশন দেখিয়ে বাকি টাকা হরিলুট হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এসব কিছু হচ্ছে স্থানীয় রাজনৈতিক দলের সাথে উপজেলা প্রশাসনসহ সরকার দলীয় একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের চাপ। ইজারাদার ইতোমধ্যে সরকারি হিসাবে ৯৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা জমা দিয়েছেন। সর্বশেষ গত ১৭ জুন তিনি বকেয়া পরিশোধের অংশ হিসেবে আরও ৫০ লাখ টাকার পে-অর্ডার নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মংচিংনু মারমার সঙ্গে দেখা করেন।
ইজারাদারের দাবি বিগত ১৪ই এপ্রিল পহেলা বৈশাখ থেকে আজকের দিন পর্যন্ত ঈদগাঁও উপজেলা ও ভূমি কর্মকর্তা মিলে খাস কালেকশন দেখিয়েছে ২৬ লক্ষ টাকা। এই হিসাব অনুযায়ী এক বছরে খাস কালেকশন দাঁড়ায় ১ কোটি ৫৭ লক্ষ টাকা। এর ফলে জনমনে প্রশ্ন জেগেছে, যেখানে এক বছরে ৪ কোটি ৯ লক্ষ টাকা ইজারায় বাজার থেকে সরকারি খাজনা আদায় করা যাচ্ছে; সেখানে ১ কোটি ৫৭ লক্ষ টাকায় নিজেরা খাস কালেকশন করে সরকারকে এত বড় বিশাল রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করছেন। এই জন্য উপজেলা প্রশাসনসহ রাজনৈতিক সিন্ডিকেট এক যোগ হয়েছেন বলে সাধারণ মানুষ মনে করেন।
গত দুই মাস ৫ দিনে খাস কালেকশনে আদায়কৃত টাকা ও ভ্যাট বাবদ প্রায় ৩১ লাখ টাকা ইজারার মূল থেকে বাদ দেওয়ার কথা থাকলেও কিন্তু UNO সেই পে-অর্ডার গ্রহণ না করে বরং পুরো ইজারা মূল্য এককালীন জমা দেওয়ার অহেতুক শর্ত জুড়ে দিয়েছেন, অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ হয়েছে।
সরেজমিনে তদন্তে দেখা গেছে অতীতে ঈদগাঁও বাজারের দরপত্র আহ্বানের পরে, যিনি সব চেয়ে বেশি ইজারা দিয়ে সরকারের কাছ থেকে দরপত্র নিতে পারতেন; ঐ গ্রহীতা ব্যক্তিই সরকারি নিয়ম অনুযায়ী প্রথমে একটা ফে অর্ডার জমা করতেন। এরপরে উপজেলা প্রশাসন থেকে একটা নির্দিষ্ট সময় দেওয়া হতো। এক সপ্তাহ দুই সপ্তাহ অথবা ২/৩ কিস্তিতে এই টাকা পরিশোধ করার জন্য সময় বেধে দেওয়া হতো। কিন্তু বর্তমানে এই নিয়মের কোন তোয়াক্কা করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই টালবাহানার নেপথ্যে রয়েছে খাস কালেকশন থেকে প্রতিদিন আদায়কৃত বিপুল অর্থের ভাগ-বাঁটোয়ারা। আরো অভিযোগ রয়েছে, এই টাকা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অফিস এবং ঈদগাঁও ইউনিয়ন ভূমি অফিসের অসাধু কর্মকর্তাসহ কতিপয় রাজনৈতিক নেতাদের পকেটে যাচ্ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ইজারা সন থেকে পার হওয়া দুই মাস ৫ দিন সময়ে কোরবানিকে কেন্দ্র করে বাজারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক মৌসুম ছিল, তখন গরু-ছাগল বেচাকেনা থেকে কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের সম্ভাবনা ছিল। অথচ UNO সহ রাজনৈতিক সিন্ডিকেট অত্যন্ত চতুরতার সাথে এই সময়ের আয় অত্যন্ত কম দেখিয়ে সরকারি রাজস্বের একটি বড় অংশ লুটপাট করেছে।
সচেতন মহলের প্রশ্ন, ইজারাদার টাকা জমা দিতে প্রস্তুত থাকা সত্ত্বেও কেন ইউএনও অফিস ইজারা হস্তান্তর করছে না? গত বছর ঈদগাঁও বাজারের ডাক হয়েছিল ৭কোটি। যিনি ইজারা নিয়েছিলেন তিনি ১ম কিস্তিতে জমা করেছিলেন ১কোটি ৩০লক্ষ টাকা। অথচ এবার উপজেলা প্রশাসন ও রাজনৈতিক সিন্ডিকেটের খাসকালেকশন এর তালবাহনা উপেক্ষা করে ভ্যাটসহ ৪কোটি ৭লক্ষ টাকায় বাজার ডাক নিয়েছেন আনোয়ার।
ইজারাদার ১ম কিস্তিতে ১কোটি ৬০লক্ষ টাকার পে অর্ডার জমা করার পরও তাকে বাজারের ইজারা হস্তান্তর করতেছেন না UNO। ওনারা কি আসলেই সরকারি রাজস্ব বাড়াতে চাইছেন; নাকি খাস কালেকশন এর দূর্ভিসন্ধি বাস্তবায়ন করার জন্য উপজেলা প্রশাসন ঈদগাঁও বাজারে ইজারা হস্তান্তর পক্রিয়া জটিলতা সৃষ্টি করে আটকে রেখেছেন(?)।
উপজেলা প্রশাসনের আওতাধীন ভুমি অফিসের দূর্নীতি বাজ কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক সিন্ডিকেটদের যোগ সাজসে আসল ও নকল রসিদ বই বানিয়ে দৈনিক ৬০০টাকা বেতনে তাদের নিজস্ব লোক নিয়োগ দিয়ে বৈধ ও অবৈধ রসিদে টাকা কালেকশন করা হয়েছে। যার যথাযথ ডকুমেন্টস ভিডিও ফুটেজ রয়েছে। ‘খাসকালেকশন’ ঘিরে কোটি টাকার রাজস্ব অনিয়মের অভিযোগ উপজেলা প্রশাসন ও রাজনৈতিক সিন্ডিকেটদের বিরুদ্ধে।
উল্লেখ্য, কতিপয় সরকার দলীয় রাজনৈতিক নেতা এবং উপজেলা প্রশাসনের যোগসাজসে ও অবৈধ হস্তক্ষেপে পরপর ৪ বার আগ্রহীদেরকে দরপত্র জমা দিতে দেয়নি। এই সিন্ডিকেট সদস্যরা শতশত দলীয় নেতাকর্মীদের কে বাজার ইজারা খাস কালেকশনে রুপান্তরিত করে সবাইকে শেয়ার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে জন প্রতি ৫ হাজার টাকা করে নিয়ে ভুমি অফিস ও ৭/৮জনের দলীয় সিন্ডিকেট লক্ষ লক্ষ টাকা ভাগবাটোয়ারা করে নিজেদের পকেট ভারী করে সাধারণ নেতাকর্মীদের সাথে প্রতারণা করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই সিন্ডিকেট গত কোরবানি মৌসুমে শুধু মাত্র বার্মিজ গরুকে বাংলাদেশী হিসেবে রসিদ দিয়ে গরুর আড়ত হতে ৫০ লক্ষ টাকা এবং গরুর বাজার হতে ১কোটি টাকার ওপর লুটপাট করেছে।
এই বিষয়ে ঈদগাঁও উপজেলা নির্বাহী অফিসার এঁর কাছে হোয়াটসঅ্যাপ ম্যাসেজে জানতে চাইলে তিঁনি জানান, ‘সরকারি ইজারা মূল্য সম্পূর্ণভাবে সরকারী কোষাগারে জমা/পরিশোধ না করা পর্যন্ত কার্যাদেশ দেওয়ার সুযোগ নাই বিধিমালা অনুযায়ী।’
এর আগে ইজারা গ্রহিতা আনোয়ার হোসেনকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইজারাদারকে ইজারা মূল্য পরিশোধের জন্য স্মারক নং ০৫.২০.২২৩২.০০০.০০০০০.২০২৬-৪২৯ তারিখ: ০৯/০৬/২০১৬ ইং মূলে পত্র ইস্যু করেন। পত্র প্রাপ্তির পর ১৭ জুন ইউএনও এঁর নিকট “ঈদগাঁও বাজার” ইজারার সমূদয় অর্থ উনপঞ্চাশ লক্ষ পঁচাশি হাজার) টাকার পে-অর্ডারসহ অবশিষ্ট পাওনা সমন্বয় পূর্বক কিস্তিতে পরিশোধের জন্য ১০ দিনের সময় প্রার্থনা করে আবেদন করেন।
বিষয়টি জেলা প্রশাসন ও বিভাগীয় কমিশনার এঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন ঈদগাঁ সচেতন মহল।
Reporter Name 



















