Lama ০৬:০০ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

থানচি কলেজে এইচএসসির ফলাফল বিপর্যয়, শিক্ষকদের দায়িত্বহীনতায় ক্ষুব্ধ অভিভাবকেরা

বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি উপজেলা থানচির একমাত্র উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থানচি কলেজে ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে চরম বিপর্যয় ঘটেছে। পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৫৪ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন মাত্র ১৩ জন। পাসের হার ২৪ দশমিক ৫৩ শতাংশ। জিপিএ-৫ কেউ পাইনি। শনিবার ৩১ অক্টোবর দুপুরে এ তথ্য নিশ্চিত করেন অধ্যক্ষ ধমিনিক ত্রিপুরা।

ফলাফল বিপর্যয়কে শিক্ষকদের দায়িত্বে অবহেলা, নিয়মিত পাঠদান না করা এবং শ্রেণিকক্ষে অনুপস্থিতির অভিযোগ তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অভিভাবকেরা। তাঁদের আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে দুর্গম এলাকার শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়বে।

কলেজের এমন ফলাফলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে হতাশা, উদ্বেগ ও ক্ষোভ বাড়ছে। তাঁদের প্রশ্ন, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ও শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের কষ্টার্জিত অর্থ ব্যয় করে কলেজ পরিচালিত হলেও কাঙ্ক্ষিত শিক্ষার পরিবেশ কেন নিশ্চিত করা যাচ্ছে না? শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দায়বদ্ধতা কার?

নাম প্রকাশের অনিচ্ছুক অনেক অভিভাবকদের অভিযোগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের নিয়মিত উপস্থিতি ও দায়িত্বশীল পাঠদান নিশ্চিত না হলে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ভালো ফলাফল আশা করা যায় না। শুধু পরীক্ষার আগে পরামর্শ দিয়ে কিংবা ফলাফল প্রকাশের পর দায় এড়িয়ে শিক্ষার মানোন্নয়ন সম্ভব নয়। শিক্ষকদের দায়িত্বে অবহেলা থাকলে তার জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।

একাধিক অভিভাবকের ভাষ্য, দুর্গম পাহাড়ি এলাকার শিক্ষার্থীরা এমনিতেই নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে পড়াশোনা করে। তাঁদের জন্য থানচি কলেজই উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার প্রধান ভরসা। অথচ এই প্রতিষ্ঠানের ফলাফল যদি ধারাবাহিকভাবে নিম্নমুখী হয়, তাহলে দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের উচ্চশিক্ষার পথ আরও কঠিন হয়ে পড়বে।

সন্তান ফলাফল বিপর্যয় কথা ভবে লিটক্রে ইয়াংব পাড়া বাসিন্দা দনরয় ম্রো বলেন, ‘আমরা সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে কলেজে পাঠাই। কিন্তু শিক্ষক যদি নিয়মিত ক্লাসে না আসেন, দায়িত্ব নিয়ে পাঠদান না করেন, তাহলে শিক্ষার্থীরা শিখবে কীভাবে? শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে এমন অবহেলা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।’

কলেজের অধ্যক্ষ ধমিনিক ত্রিপুরার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে কলেজ প্রতিষ্ঠার পর প্রথম এইচএসসি পরীক্ষায় ২২ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১৩ জন উত্তীর্ণ হন। পরবর্তী সময়ে ফলাফলে উন্নতি হলেও ২০২৫ সালে পাসের হার ছিল ৬১ দশমিক ০৯ শতাংশ। আর ২০২৬ সালে তা নেমে এসেছে ২৪ দশমিক ৫৩ শতাংশে। এর আগের বছর পাসের হার ৭৫ শতাংশ ছিল বলেও অধ্যক্ষ জানিয়েছেন।

চলতি বছর কলেজ থেকে ৫৪ জন শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য নিবন্ধিত হলেও একজন পরীক্ষায় অংশ নেননি। ফলে পরীক্ষায় অংশ নেন ৫৩ জন। তাঁদের মধ্যে পাস করেছেন ১৩ জন। উত্তীর্ণদের কারও ফলাফলে জিপিএ-৫ নেই।

ফলাফল বিপর্যয়ের কারণ জানতে চাইলে অধ্যক্ষ ধমিনিক ত্রিপুরা সাংবাদিকদের তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করবেন বলে জানান। তবে ফলাফল বিপর্যয়ের কারণ সম্পর্কে মন্তব্য করতে তিনি অপারগতা প্রকাশ করেন।

অভিভাবকদের দাবি, শুধু ফলাফল প্রকাশ করে দায় শেষ করলে চলবে না। কলেজে শিক্ষকদের নিয়মিত উপস্থিতি, শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের পরিবেশ, পাঠ্যসূচি যথাসময়ে শেষ করা এবং শিক্ষার্থীদের নিয়মিত মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ফলাফল বিপর্যয়ের কারণ অনুসন্ধানে নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

দুর্গম থানচির শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার পথ সুগম করতে হলে এখনই কলেজের শিক্ষার পরিবেশ ও পাঠদানের মান ফিরিয়ে আনা জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয় অভিভাবকেরা।

 

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

Popular Post

যুদ্ধবিরতি নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন বার্তা 

Bandarban Tribune

থানচি কলেজে এইচএসসির ফলাফল বিপর্যয়, শিক্ষকদের দায়িত্বহীনতায় ক্ষুব্ধ অভিভাবকেরা

Update Time : ০৪:৩৭:৫৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬

বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি উপজেলা থানচির একমাত্র উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থানচি কলেজে ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে চরম বিপর্যয় ঘটেছে। পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৫৪ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন মাত্র ১৩ জন। পাসের হার ২৪ দশমিক ৫৩ শতাংশ। জিপিএ-৫ কেউ পাইনি। শনিবার ৩১ অক্টোবর দুপুরে এ তথ্য নিশ্চিত করেন অধ্যক্ষ ধমিনিক ত্রিপুরা।

ফলাফল বিপর্যয়কে শিক্ষকদের দায়িত্বে অবহেলা, নিয়মিত পাঠদান না করা এবং শ্রেণিকক্ষে অনুপস্থিতির অভিযোগ তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অভিভাবকেরা। তাঁদের আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে দুর্গম এলাকার শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়বে।

কলেজের এমন ফলাফলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে হতাশা, উদ্বেগ ও ক্ষোভ বাড়ছে। তাঁদের প্রশ্ন, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ও শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের কষ্টার্জিত অর্থ ব্যয় করে কলেজ পরিচালিত হলেও কাঙ্ক্ষিত শিক্ষার পরিবেশ কেন নিশ্চিত করা যাচ্ছে না? শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দায়বদ্ধতা কার?

নাম প্রকাশের অনিচ্ছুক অনেক অভিভাবকদের অভিযোগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের নিয়মিত উপস্থিতি ও দায়িত্বশীল পাঠদান নিশ্চিত না হলে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ভালো ফলাফল আশা করা যায় না। শুধু পরীক্ষার আগে পরামর্শ দিয়ে কিংবা ফলাফল প্রকাশের পর দায় এড়িয়ে শিক্ষার মানোন্নয়ন সম্ভব নয়। শিক্ষকদের দায়িত্বে অবহেলা থাকলে তার জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।

একাধিক অভিভাবকের ভাষ্য, দুর্গম পাহাড়ি এলাকার শিক্ষার্থীরা এমনিতেই নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে পড়াশোনা করে। তাঁদের জন্য থানচি কলেজই উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার প্রধান ভরসা। অথচ এই প্রতিষ্ঠানের ফলাফল যদি ধারাবাহিকভাবে নিম্নমুখী হয়, তাহলে দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের উচ্চশিক্ষার পথ আরও কঠিন হয়ে পড়বে।

সন্তান ফলাফল বিপর্যয় কথা ভবে লিটক্রে ইয়াংব পাড়া বাসিন্দা দনরয় ম্রো বলেন, ‘আমরা সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে কলেজে পাঠাই। কিন্তু শিক্ষক যদি নিয়মিত ক্লাসে না আসেন, দায়িত্ব নিয়ে পাঠদান না করেন, তাহলে শিক্ষার্থীরা শিখবে কীভাবে? শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে এমন অবহেলা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।’

কলেজের অধ্যক্ষ ধমিনিক ত্রিপুরার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে কলেজ প্রতিষ্ঠার পর প্রথম এইচএসসি পরীক্ষায় ২২ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১৩ জন উত্তীর্ণ হন। পরবর্তী সময়ে ফলাফলে উন্নতি হলেও ২০২৫ সালে পাসের হার ছিল ৬১ দশমিক ০৯ শতাংশ। আর ২০২৬ সালে তা নেমে এসেছে ২৪ দশমিক ৫৩ শতাংশে। এর আগের বছর পাসের হার ৭৫ শতাংশ ছিল বলেও অধ্যক্ষ জানিয়েছেন।

চলতি বছর কলেজ থেকে ৫৪ জন শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য নিবন্ধিত হলেও একজন পরীক্ষায় অংশ নেননি। ফলে পরীক্ষায় অংশ নেন ৫৩ জন। তাঁদের মধ্যে পাস করেছেন ১৩ জন। উত্তীর্ণদের কারও ফলাফলে জিপিএ-৫ নেই।

ফলাফল বিপর্যয়ের কারণ জানতে চাইলে অধ্যক্ষ ধমিনিক ত্রিপুরা সাংবাদিকদের তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করবেন বলে জানান। তবে ফলাফল বিপর্যয়ের কারণ সম্পর্কে মন্তব্য করতে তিনি অপারগতা প্রকাশ করেন।

অভিভাবকদের দাবি, শুধু ফলাফল প্রকাশ করে দায় শেষ করলে চলবে না। কলেজে শিক্ষকদের নিয়মিত উপস্থিতি, শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের পরিবেশ, পাঠ্যসূচি যথাসময়ে শেষ করা এবং শিক্ষার্থীদের নিয়মিত মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ফলাফল বিপর্যয়ের কারণ অনুসন্ধানে নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

দুর্গম থানচির শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার পথ সুগম করতে হলে এখনই কলেজের শিক্ষার পরিবেশ ও পাঠদানের মান ফিরিয়ে আনা জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয় অভিভাবকেরা।