Lama ০৫:১৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
দুর্ভোগে দুই লাখ মানুষ: অনতিবিলম্ব আদেশ প্রত্যাহারের দাবি

লামায় সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয় বান্দরবানে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত

​বান্দরবান জেলার লামা উপজেলায় দীর্ঘদিনের প্রচলিত ভূমি রেজিস্ট্রেশন (সাব-রেজিস্ট্রি) কার্যক্রম জেলা সদরে স্থানান্তরের প্রশাসনিক আদেশে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝে। প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তের ফলে উপজেলার প্রায় দুই লাখ মানুষকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দুর্গম পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে জেলা সদরে গিয়ে সেবা নিতে হচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষের যাতায়াত ব্যয় ও ভোগান্তি বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

​এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে এবং অবর্ণনীয় জনদুর্ভোগ লাঘবে স্থানীয় বাসিন্দারা সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে আবেদন জানানোর পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদসহ একাধিক সংগঠন কড়া আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছে।

​আদেশের নেপথ্যে ও বর্তমান পরিস্থিতি:

​গত ২৬ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে বান্দরবান জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের স্মারক নং ০৫.৪২.০৩০০.০০০.২১০.০৫.০০০৭.২৬.৬৪৪ পত্রের মাধ্যমে ১৯০০ সালের ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসন বিধিমালা’র (CHT Regulation 1900) ২০ বিধির আলোকে লামা উপজেলার সাব-রেজিস্ট্রশন কার্যক্রম জেলা প্রশাসনের রেজিস্ট্রেশন শাখায় স্থানান্তরের নির্দেশ জারি করা হয়।

​এর পূর্বে দীর্ঘদিন ধরে লামা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে স্থানীয়ভাবে সফলতার সাথে এই ভূমি রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিলেন। ফলে স্থানীয় বাসিন্দারা নিজ উপজেলাতেই দ্রুত ও হয়রানিমুক্ত সেবা পাচ্ছিলেন। আদেশ জারির পর থেকে উপজেলা পর্যায়ের এই নাগরিক সেবা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।

​জনদুর্ভোগের চিত্র:

​লামা উপজেলার বাসিন্দারা জানান, জেলা সদরে গিয়ে ভূমি সংক্রান্ত সেবা নেওয়ার প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত কষ্টসাধ্য ও ব্যয়বহুল। দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের কারণে প্রায় শত কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে সাধারণ মানুষের অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় হচ্ছে। বিশেষ করে বয়োবৃদ্ধ, নারী, অসুস্থ ব্যক্তি এবং নিম্নআয়ের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পক্ষে এই যাতায়াত প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

​স্থানীয় এক ভুক্তভোগী জানান, “একটি সামান্য রেজিস্ট্রি কাজের জন্য আমাদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাহাড়ি পথে যাতায়াত করতে হচ্ছে। কাজের পাশাপাশি অর্থ ও সময়ের যে অপচয় হচ্ছে, তা আমাদের মতো সাধারণ মানুষের জন্য বড় বোঝা।”

স্থানীয়দের দাবি:

জনস্বার্থ এবং প্রশাসনিক সহজীকরণের বিষয়টি বিবেচনা করে অনতিবিলম্বে লামা উপজেলাতেই পূর্বের ন্যায় ইউএনও বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অধীনে রেজিষ্ট্রেশন ও সাব-রেজিস্ট্রি কার্যক্রম পুনরায় চালু করা প্রয়োজন।

​আন্দোলনের হুঁশিয়ারি ও ১৯০০ সালের আইন বাতিলের দাবি:

​এদিকে প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তকে ‘জনবিরোধী’ ও ‘একতরফা’ আখ্যা দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদের নেতারা তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। সংগঠনটি দ্রুত এই আদেশ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে; অন্যথায় কড়া কর্মসূচির মাধ্যমে আন্দোলনে নামার হুশিয়ারী দেওয়া হয়েছে।

​একই সাথে নেতৃবৃন্দ অভিযোগ করেন, ব্রিটিশ আমলে প্রণীত শতাব্দী প্রাচীন ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি ১৯০০’ কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে পার্বত্য অঞ্চলের সাধারণ মানুষকে নাগরিক অধিকার ও মৌলিক সেবা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। তারা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই প্রাচীন শাসনবিধি বাতিলের পাশাপাশি পাহাড়ে আধুনিক ও গতিশীল প্রশাসনিক ব্যবস্থার জোর দাবি জানান।

​ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বক্তব্য:

​বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, বিদ্যমান আইনি কাঠামো ও প্রশাসনিক নির্দেশনার আলোকেই এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয়েছে। তবে জনগণের সার্বিক ভোগান্তি ও স্থানীয় দাবির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সরকার পরবর্তীতে কী পদক্ষেপ নেয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

 

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

Popular Post

লংগদুতে সেনাবাহিনীর অভিযানে গাঁজাসহ দুই মাদক কারবারি আটক

Bandarban Tribune

দুর্ভোগে দুই লাখ মানুষ: অনতিবিলম্ব আদেশ প্রত্যাহারের দাবি

লামায় সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয় বান্দরবানে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত

Update Time : ০৩:৪৫:৫৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬

​বান্দরবান জেলার লামা উপজেলায় দীর্ঘদিনের প্রচলিত ভূমি রেজিস্ট্রেশন (সাব-রেজিস্ট্রি) কার্যক্রম জেলা সদরে স্থানান্তরের প্রশাসনিক আদেশে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝে। প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তের ফলে উপজেলার প্রায় দুই লাখ মানুষকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দুর্গম পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে জেলা সদরে গিয়ে সেবা নিতে হচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষের যাতায়াত ব্যয় ও ভোগান্তি বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

​এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে এবং অবর্ণনীয় জনদুর্ভোগ লাঘবে স্থানীয় বাসিন্দারা সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে আবেদন জানানোর পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদসহ একাধিক সংগঠন কড়া আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছে।

​আদেশের নেপথ্যে ও বর্তমান পরিস্থিতি:

​গত ২৬ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে বান্দরবান জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের স্মারক নং ০৫.৪২.০৩০০.০০০.২১০.০৫.০০০৭.২৬.৬৪৪ পত্রের মাধ্যমে ১৯০০ সালের ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসন বিধিমালা’র (CHT Regulation 1900) ২০ বিধির আলোকে লামা উপজেলার সাব-রেজিস্ট্রশন কার্যক্রম জেলা প্রশাসনের রেজিস্ট্রেশন শাখায় স্থানান্তরের নির্দেশ জারি করা হয়।

​এর পূর্বে দীর্ঘদিন ধরে লামা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে স্থানীয়ভাবে সফলতার সাথে এই ভূমি রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিলেন। ফলে স্থানীয় বাসিন্দারা নিজ উপজেলাতেই দ্রুত ও হয়রানিমুক্ত সেবা পাচ্ছিলেন। আদেশ জারির পর থেকে উপজেলা পর্যায়ের এই নাগরিক সেবা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।

​জনদুর্ভোগের চিত্র:

​লামা উপজেলার বাসিন্দারা জানান, জেলা সদরে গিয়ে ভূমি সংক্রান্ত সেবা নেওয়ার প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত কষ্টসাধ্য ও ব্যয়বহুল। দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের কারণে প্রায় শত কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে সাধারণ মানুষের অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় হচ্ছে। বিশেষ করে বয়োবৃদ্ধ, নারী, অসুস্থ ব্যক্তি এবং নিম্নআয়ের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পক্ষে এই যাতায়াত প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

​স্থানীয় এক ভুক্তভোগী জানান, “একটি সামান্য রেজিস্ট্রি কাজের জন্য আমাদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাহাড়ি পথে যাতায়াত করতে হচ্ছে। কাজের পাশাপাশি অর্থ ও সময়ের যে অপচয় হচ্ছে, তা আমাদের মতো সাধারণ মানুষের জন্য বড় বোঝা।”

স্থানীয়দের দাবি:

জনস্বার্থ এবং প্রশাসনিক সহজীকরণের বিষয়টি বিবেচনা করে অনতিবিলম্বে লামা উপজেলাতেই পূর্বের ন্যায় ইউএনও বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অধীনে রেজিষ্ট্রেশন ও সাব-রেজিস্ট্রি কার্যক্রম পুনরায় চালু করা প্রয়োজন।

​আন্দোলনের হুঁশিয়ারি ও ১৯০০ সালের আইন বাতিলের দাবি:

​এদিকে প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তকে ‘জনবিরোধী’ ও ‘একতরফা’ আখ্যা দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদের নেতারা তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। সংগঠনটি দ্রুত এই আদেশ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে; অন্যথায় কড়া কর্মসূচির মাধ্যমে আন্দোলনে নামার হুশিয়ারী দেওয়া হয়েছে।

​একই সাথে নেতৃবৃন্দ অভিযোগ করেন, ব্রিটিশ আমলে প্রণীত শতাব্দী প্রাচীন ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি ১৯০০’ কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে পার্বত্য অঞ্চলের সাধারণ মানুষকে নাগরিক অধিকার ও মৌলিক সেবা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। তারা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই প্রাচীন শাসনবিধি বাতিলের পাশাপাশি পাহাড়ে আধুনিক ও গতিশীল প্রশাসনিক ব্যবস্থার জোর দাবি জানান।

​ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বক্তব্য:

​বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, বিদ্যমান আইনি কাঠামো ও প্রশাসনিক নির্দেশনার আলোকেই এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয়েছে। তবে জনগণের সার্বিক ভোগান্তি ও স্থানীয় দাবির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সরকার পরবর্তীতে কী পদক্ষেপ নেয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।