
ইসরায়েলের নির্বাচনে প্রত্যাশিত ফল না পেয়ে নতুন রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর পর নির্বাচনে বিদেশি হস্তক্ষেপ, ভোটারদের প্রভাবিত করা এবং অর্থায়নের অভিযোগ তুলেছে তাঁর দল লিকুদ পার্টি।
বিশেষ করে আরব নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী সাফল্যকে কেন্দ্র করে এই বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। বিরোধীদের অভিযোগ, নির্বাচনে পরাজয়ের বাস্তবতা মেনে না নিয়ে ফলাফলকে প্রশ্নবিদ্ধ করার রাজনৈতিক কৌশল নিয়েছেন নেতানিয়াহু।
নির্বাচনের ফল অনুযায়ী, ইসরায়েলের ১২০ আসনের পার্লামেন্ট নেসেটে নেতানিয়াহুর জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন। অন্যদিকে প্রধান বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৪৮টি আসন। তবে কোনো পক্ষই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। এই পরিস্থিতিতে আরব নেতৃত্বাধীন জয়েন্ট লিস্ট ও রাআম জোটের সম্মিলিত ১৯টি আসন সরকার গঠনের সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এবারের নির্বাচনে আরব ভোটারদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি এবং তাঁদের রাজনৈতিক দলগুলোর আসন বৃদ্ধি ইসরায়েলের ক্ষমতার হিসাব পাল্টে দিয়েছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে দেশটির রাজনীতিতে প্রান্তিক অবস্থানে থাকা আরব দলগুলো এখন সরকার গঠনের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
বিদেশি অর্থায়নের অভিযোগ ঘিরে তদন্ত
নির্বাচনের পর বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগ তদন্তে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা শিন বেইতকে দায়িত্ব দিয়েছে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে কাতারের সম্ভাব্য অর্থায়ন। ইসরায়েলি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আরব ভোটারদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ বাড়াতে বিদেশি অর্থ ব্যবহারের সন্দেহ থেকে তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে অভিযোগ এখনো প্রমাণিত হয়নি। কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ডিন লিভনে জানিয়েছেন, নির্বাচনে ব্যাপক জালিয়াতি কিংবা পদ্ধতিগত অনিয়মের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। শিন বেইতও জানিয়েছে, তাদের তদন্তের পরিধি সীমিত। কোনো একটি গোষ্ঠীর বৈধ ভোটাধিকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করার সুযোগ নেই। অন্যদিকে কাতার এসব অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি বলেছেন, ইসরায়েলের নির্বাচনে হস্তক্ষেপ কিংবা ফলাফল প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে কোনো অর্থায়নের সঙ্গে দোহার সম্পৃক্ততা নেই। তাঁর ভাষায়, এ ধরনের অভিযোগ ভিত্তিহীন ও বিপজ্জনক।
বিরোধীদের অভিযোগ, ক্ষমতা ধরে রাখার কৌশল
নেতানিয়াহুর অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে করছেন বিরোধী নেতারা। গাদি আইজেনকটের দাবি, নির্বাচনের ফলাফলকে অবৈধ প্রমাণের জন্য লিকুদ পার্টি পরিকল্পিত প্রচারণা চালাচ্ছে। তাঁর আশঙ্কা, বিদেশি হস্তক্ষেপের তদন্তকে সামনে রেখে নতুন পার্লামেন্টের কার্যক্রম কিংবা সরকার গঠনের প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা হতে পারে।
আরব দলগুলোর নেতারাও অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। জয়েন্ট লিস্টের শরিক বালাদ পার্টির চেয়ারম্যান সামি আবু শেহাদেহের মতে, নির্বাচনে পরাজিত পক্ষ আরব ভোটারদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চাইছে।
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ
ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আরব নাগরিক। তাঁদের একটি বড় অংশ নিজেদের ফিলিস্তিনি পরিচয়ে পরিচিত করেন। দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় আরব দলগুলোর প্রভাব সীমিত থাকলেও এবারের নির্বাচনে তাঁদের সাফল্য নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, আইজেনকট আরব দলগুলোর সমর্থন নিয়ে সরকার গঠনের উদ্যোগ নেবেন কি না। যদিও এ ধরনের রাজনৈতিক সমঝোতা ইসরায়েলের প্রচলিত রাজনীতিতে সহজ হবে না। দেশটির বিভিন্ন ইহুদি রাজনৈতিক দলের মধ্যে আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠন নিয়ে আপত্তি রয়েছে।
এ পরিস্থিতি শুধু ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াই নয়, মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গেও সম্পর্কিত। গাজা যুদ্ধ, ফিলিস্তিন প্রশ্ন, ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা এবং আরব বিশ্বের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক—সব ক্ষেত্রেই নতুন সরকারের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
নির্বাচনের ফলাফলে স্পষ্ট হয়েছে, নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আধিপত্য এবার চ্যালেঞ্জের মুখে। তবে বিরোধী জোটও এখনো সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে পারেনি। ফলে ইসরায়েল আপাতত অনিশ্চিত জোট আলোচনা ও রাজনৈতিক দর-কষাকষির পথে এগোচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে নির্বাচনী অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সব পক্ষের রাজনৈতিক সমঝোতাই দেশটির পরবর্তী ক্ষমতার কাঠামো নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বান্দরবান ট্রিবিউন ডেস্ক: 



















