Lama ১২:২১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সরকার দেশে গুমের সংস্কৃতি বন্ধ করতে চায়

দেশে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং পুলিশি ও কারা হেফাজতে মৃত্যুর মতো ঘটনা চিরতরে বন্ধ করতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

তিনি বলেছেন, গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের ন্যায়বিচার, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের দাবি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে সরকার। ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে প্রয়োজনে নতুন আইন প্রণয়নের বিষয়টিও বিবেচনা করা হবে।

বুধবার (২৮ অক্টোবর) জাতীয় সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির নবম বৈঠক শেষে সংসদের মিডিয়া সেন্টারে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে এ কথা বলেন কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গত ১৭ বছরে গুম, খুন ও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্য এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনদের বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়, ‘মায়ের ডাক’সহ কয়েকটি সংগঠনের সহযোগিতায় ৪৮ জনের প্রতিনিধিত্বমূলক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়।

তিনি বলেন, নিখোঁজ ব্যক্তিদের কারও স্ত্রী, কারও সন্তান, আবার কারও বাবা-মা দীর্ঘদিন ধরে প্রিয়জনের অপেক্ষায় রয়েছেন। এসব পরিবারের সদস্যদের আবেগ, বেদনা ও অভিজ্ঞতার কথা শুনে কমিটির সদস্যরা মর্মাহত হয়েছেন। অনেকে আবেগাপ্লুত হয়ে বক্তব্যও শেষ করতে পারেননি।

ন্যায়বিচার ও পুনর্বাসনের দাবি

বৈঠকে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর পক্ষ থেকে গুমের পুনরাবৃত্তি রোধ, দায়ের করা মামলাগুলোর দ্রুত ও সুষ্ঠু বিচার, নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের সহায়তা ও পুনর্বাসন এবং গুমের শিকার ব্যক্তিদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিধান রয়েছে। আদালতের নির্দেশে দায়ী ব্যক্তিদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও বিক্রি করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া যেতে পারে। দায়ী ব্যক্তিদের সম্পদ না থাকলে বা সেই সম্পদ থেকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া সম্ভব না হলে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিধান রয়েছে।

দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকা ব্যক্তিদের সম্পত্তির দেখভাল ও ব্যবস্থাপনার জন্যও আইনি ব্যবস্থা রয়েছে বলে জানান তিনি। আদালতের অনুমতি নিয়ে এসব সম্পত্তি পরিচালনা করা সম্ভব।

অভিযোগের তদন্ত হবে অন্য বাহিনীর মাধ্যমে

গুমের অভিযোগ তদন্তের বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে সেই বাহিনীর সংশ্লিষ্ট শাখা দিয়ে তদন্ত করা হবে না। অন্য বাহিনী তদন্ত করবে।

তিনি আরও বলেন, ফৌজদারি অপরাধের ক্ষেত্রে প্রচলিত আইন অনুযায়ী বিচার হবে। আর বিভাগীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের ঘটনায় বিভাগীয় প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদে জীবনের অধিকারের সুরক্ষা রয়েছে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এই অধিকারের পরিপন্থী কর্মকাণ্ড সংবিধান লঙ্ঘনের শামিল। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে মানুষ এমন একটি বাংলাদেশের প্রত্যাশা করেছে, যেখানে মানবাধিকার সুরক্ষিত থাকবে এবং প্রত্যেক নাগরিক ন্যায়বিচার পাবেন।

সংবিধান সংশোধন নিয়ে আলোচনা চলছে

সংবিধান সংশোধন প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছ থেকে পাওয়া প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনা করে বিশেষ কমিটিতে আলোচনা করা হবে। এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের বিষয়ে একমত হলেও এর গঠনপ্রক্রিয়া, কার্যপরিধি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন প্রস্তাব পরীক্ষা করা হবে বলে জানান তিনি।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমরা চাই, বাংলাদেশে আর কখনো এমন সময় ফিরে না আসুক। গুমের অপসংস্কৃতি ও অপরাধ চিরতরে বন্ধ হোক।’

বৈঠকে কমিটির সদস্য ও আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, জয়নুল আবেদীন, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী আন্দালিব রহমান, প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মো. নূরুল হক এবং সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন অংশ নেন।

এ ছাড়া গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্য হিসেবে সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম, হুমাম কাদের চৌধুরী, আনিছুর রহমান ও মোছা. তাহসিনা রুশদী বৈঠকে নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তাঁরা নির্যাতনের ঘটনা, আইনগত সুরক্ষা ও ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়ার বিষয়গুলো তুলে ধরে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

বৈঠকে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব, আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

Popular Post

সরকার দেশে গুমের সংস্কৃতি বন্ধ করতে চায়

Bandarban Tribune

সরকার দেশে গুমের সংস্কৃতি বন্ধ করতে চায়

Update Time : ১০:৪৬:২৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬

দেশে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং পুলিশি ও কারা হেফাজতে মৃত্যুর মতো ঘটনা চিরতরে বন্ধ করতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

তিনি বলেছেন, গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের ন্যায়বিচার, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের দাবি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে সরকার। ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে প্রয়োজনে নতুন আইন প্রণয়নের বিষয়টিও বিবেচনা করা হবে।

বুধবার (২৮ অক্টোবর) জাতীয় সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির নবম বৈঠক শেষে সংসদের মিডিয়া সেন্টারে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে এ কথা বলেন কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গত ১৭ বছরে গুম, খুন ও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্য এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনদের বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়, ‘মায়ের ডাক’সহ কয়েকটি সংগঠনের সহযোগিতায় ৪৮ জনের প্রতিনিধিত্বমূলক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়।

তিনি বলেন, নিখোঁজ ব্যক্তিদের কারও স্ত্রী, কারও সন্তান, আবার কারও বাবা-মা দীর্ঘদিন ধরে প্রিয়জনের অপেক্ষায় রয়েছেন। এসব পরিবারের সদস্যদের আবেগ, বেদনা ও অভিজ্ঞতার কথা শুনে কমিটির সদস্যরা মর্মাহত হয়েছেন। অনেকে আবেগাপ্লুত হয়ে বক্তব্যও শেষ করতে পারেননি।

ন্যায়বিচার ও পুনর্বাসনের দাবি

বৈঠকে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর পক্ষ থেকে গুমের পুনরাবৃত্তি রোধ, দায়ের করা মামলাগুলোর দ্রুত ও সুষ্ঠু বিচার, নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের সহায়তা ও পুনর্বাসন এবং গুমের শিকার ব্যক্তিদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিধান রয়েছে। আদালতের নির্দেশে দায়ী ব্যক্তিদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও বিক্রি করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া যেতে পারে। দায়ী ব্যক্তিদের সম্পদ না থাকলে বা সেই সম্পদ থেকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া সম্ভব না হলে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিধান রয়েছে।

দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকা ব্যক্তিদের সম্পত্তির দেখভাল ও ব্যবস্থাপনার জন্যও আইনি ব্যবস্থা রয়েছে বলে জানান তিনি। আদালতের অনুমতি নিয়ে এসব সম্পত্তি পরিচালনা করা সম্ভব।

অভিযোগের তদন্ত হবে অন্য বাহিনীর মাধ্যমে

গুমের অভিযোগ তদন্তের বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে সেই বাহিনীর সংশ্লিষ্ট শাখা দিয়ে তদন্ত করা হবে না। অন্য বাহিনী তদন্ত করবে।

তিনি আরও বলেন, ফৌজদারি অপরাধের ক্ষেত্রে প্রচলিত আইন অনুযায়ী বিচার হবে। আর বিভাগীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের ঘটনায় বিভাগীয় প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদে জীবনের অধিকারের সুরক্ষা রয়েছে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এই অধিকারের পরিপন্থী কর্মকাণ্ড সংবিধান লঙ্ঘনের শামিল। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে মানুষ এমন একটি বাংলাদেশের প্রত্যাশা করেছে, যেখানে মানবাধিকার সুরক্ষিত থাকবে এবং প্রত্যেক নাগরিক ন্যায়বিচার পাবেন।

সংবিধান সংশোধন নিয়ে আলোচনা চলছে

সংবিধান সংশোধন প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছ থেকে পাওয়া প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনা করে বিশেষ কমিটিতে আলোচনা করা হবে। এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের বিষয়ে একমত হলেও এর গঠনপ্রক্রিয়া, কার্যপরিধি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন প্রস্তাব পরীক্ষা করা হবে বলে জানান তিনি।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমরা চাই, বাংলাদেশে আর কখনো এমন সময় ফিরে না আসুক। গুমের অপসংস্কৃতি ও অপরাধ চিরতরে বন্ধ হোক।’

বৈঠকে কমিটির সদস্য ও আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, জয়নুল আবেদীন, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী আন্দালিব রহমান, প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মো. নূরুল হক এবং সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন অংশ নেন।

এ ছাড়া গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্য হিসেবে সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম, হুমাম কাদের চৌধুরী, আনিছুর রহমান ও মোছা. তাহসিনা রুশদী বৈঠকে নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তাঁরা নির্যাতনের ঘটনা, আইনগত সুরক্ষা ও ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়ার বিষয়গুলো তুলে ধরে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

বৈঠকে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব, আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।