
বান্দরবানের লামা সরই ইউনিয়নে বিচার-সালিশ মেনেও বেঁকে বসেছেন, ১ম পক্ষ ইসমাইল; সংঘাতের আশঙ্কায় স্থানীয়রা। কোটি টাকার ক্ষতির সম্মুখীন নারী উদ্দ্যেক্তা ফজিয়া ইসলামের কৃষি খামার।
লামা উপজেলার সরই ইউনিয়নে দীর্ঘদিনের জমি ও বৃক্ষ কর্তন সংক্রান্ত বিরোধ নিরসনে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে সম্পাদিত এক আপোষনামা চুক্তির কিছু দিন না যেতেই চরম লঙ্ঘনের মুখে পড়েছে। সমঝোতার শর্ত মেনে ২য় পক্ষ আপোষের সকল শর্ত মেনে নিলেও, ১ম পক্ষ মোঃ ইসমাইলের বিরুদ্ধে সমঝোতা ভঙ্গ করে প্রতিপক্ষের শ্রমিকদের কাজে বাধা এবং নতুন করে মিথ্যা মামলা ও হামলার হুমকি দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় শালিসদার ও প্রশাসনের মধ্যস্থতায় সই হওয়া চুক্তির এমন একতরফা লঙ্ঘনে এলাকায় নতুন করে বড় ধরনের সংঘাত ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, ডলুছড়ি মৌজায় জমি-জমা এবং সৃজিত একাশি ও ম্যালেরিয়া গাছ কাটাকে কেন্দ্র করে মোঃ ইসমাইল (১ম পক্ষ) এবং ফৌজিয়া ইসলাম ও তাঁর বাগান পরিচালক মোঃ জামাল উদ্দিন ফরাজীর (২য় পক্ষ) মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনা চলছিল। উক্ত বিরোধের জের ধরে লামা চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ইসমাইল কর্তৃক একটি সিআর মামলা (নং- ২৭০/২৩) এবং লামা থানায় ২য় পক্ষ কর্তৃক একটি জবরদখল সংক্রান্ত জি.আর মামলা (নং- ৯৯/২৩) রুজু হয়।
চলমান এই সামাজিক ও আইনি বিরোধ অবসানে গত ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে ৫নং সরই ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মোঃ জয়নাল আবেদীন (জানু মেম্বার) এবং এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে সরেজমিনে তদন্তপূর্বক একটি লিখিত আপোষনামা সম্পাদিত হয়। আপোষনামার শর্তানুযায়ী বিগত ৭ সেপ্টেম্বর/২৬ তারিখে ২য় পক্ষ কর্তৃক কর্তনকৃত গাছের ক্ষতিপূরণ বাবদ ১০ লক্ষ টাকা এবং ১ম পক্ষের ছেলে শফিকুল ইসলাম কর্তৃক রোপণকৃত ১২,০০০টি চারার মূল্য বাবদ ৪ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা; সর্বমোট চৌদ্দ লক্ষ পঞ্চাশ হাজার টাকা ১ম পক্ষ মোঃ ইসমাইল ও তার ছেলে শফিকুল ইসলাম নগদে বুঝে নেন। একই দিন ১ম পক্ষ বিজ্ঞ আদাললতে মামলা প্রত্যাহার করেন। কিন্তু ২য় পক্ষের জি.আর মামলা (নং- ৯৯/২৩) টি প্রত্যাহার না হলেও মামলা শেষ করে দেয়ার পক্রিয়া চলমান বলে জানাযায়।

চুক্তি অনুযায়ী ১ম পক্ষ তার খরিদা আর/২৭৯নং হোল্ডিংয়ের ৪.০০ একর জায়গা ২য় পক্ষের অনুকূলে ছেড়ে দেন। অন্যদিকে ২য় পক্ষ তার নিয়ন্ত্রণাধীন আর/৫৯নং হোল্ডিংয়ের ৩.৭৫ একর জায়গাসহ ১ম পক্ষের মোট পাওনা সমন্বয় করে সর্বমোট দশ একর জায়গা ১ম পক্ষকে মেপে বুঝিয়ে দেন। চুক্তি স্বাক্ষরের দিনই উভয় পক্ষ সরেজমিনে নিজ নিজ এওয়াজ-বদলকৃত জায়গা বুঝে নেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২য় পক্ষ চুক্তির শর্ত মেনে চললেও ১ম পক্ষ মোঃ ইসমাইল হঠাৎ বেঁকে বসেছেন। এওয়াজ-বদল অনুযায়ী ২য় পক্ষকে হস্তান্তরিত আর/২৭৯নং হোল্ডিংয়ের চার একর জমিতে ২য় পক্ষের নিয়োজিত প্রতিনিধি ও শ্রমিকরা কাজ করতে গেলে ১ম পক্ষ ও তার লোকজন বেআইনিভাবে তাদের বাধা প্রদান করছেন।
অভিযোগ রয়েছে, ১ম পক্ষ তার সহযোগী অন্য জবর দখলকারীদের মদদে ২য় পক্ষের বাগানের কর্মচারী ও সাধারণ শ্রমিকদের প্রকাশ্যে গালিগালাজ, মারধর ও নতুন করে মিথ্যা মামলা-হামলায় জড়ানোর হুমকি দিচ্ছেন। স্ব-জ্ঞানে ও স্ব-ইচ্ছায় আপোষনামায় স্বাক্ষর দেওয়ার পর এখন তা একতরফা অস্বীকার করায় স্তম্ভিত স্থানীয় বিচারক ও এলাকাবাসী।
ভুক্তভোগী ২য় পক্ষের বক্তব্য হচ্ছে; “আমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে সালিশের সব শর্ত মেনে নিয়েছি। কিন্তু জায়গা বুঝে পাওয়ার পর এখন ১ম পক্ষ দলবল নিয়ে আমাদের শ্রমিকদের মারধর ও হত্যার হুমকি দিচ্ছে। আমরা বিষয়টি অবিলম্বে লামা থানা ও বিজ্ঞ আদালতকে অবহিত করবো।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে হস্তলিখিত ও স্বাক্ষরিত আপোষনামা নৈতিক ও সামাজিকভাবে উভয় পক্ষকে আবদ্ধ করে। আদালতের জ্ঞাতসারে সমঝোতা করে পরবর্তীতে এভাবে চুক্তি লঙ্ঘন করা বিচার ব্যবস্থার প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শনের সামিল। ১ম পক্ষের এমন আক্রমণাত্মক ও উসকানিমূলক মনোভাবের কারণে ডলুছড়ি মৌজায় যেকোনো মুহূর্তে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
এ বিষয়ে স্থানীয় শালিসদার ও ২য় পক্ষের প্রতিনিধিরা জানান, তাঁরা শালিসদারদের মধ্যস্থতায় ও স্থানীয় প্রশাসনের সাহায্যে শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের জোর দাবি জানাচ্ছেন।
২৪ অক্টোবর সকাল ১১টায় লামার কয়জন সিনিয়র সাংবাদিক সরেজমিন অনুসন্ধানকালে ১ম পক্ষ মোঃ ইসমাইল এর সাথে আলাপকালে, সে ২য় পক্ষ ফৌজিয়া ইসলাম ও বাগান পরিচালক মোঃ জামাল উদ্দিন ফরাজীর কাছ থেকে চৌদ্দলাখ পঁঞ্চাশ হাজার টাকা বুঝে নেয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন। তবে বিগত ৭ সেপ্টেম্বর/২৬ তারিখে সম্পাদিত চুক্তি মানবেনা মর্মে সাফ জবাব দেন।
চুক্তি না মানার কারন ব্যাখ্যা দিয়ে ১ম পক্ষের ইসমাইল আরো বলেন, এওয়াজ-বদল (জমি বিনিময়) চুক্তির আওতায় ২য় পক্ষ তাকে যে জমিটি দিয়েছিল, সেখানে তার নিজের স্বজনদেরই মালিকানার দাবি রয়েছে। ২য় পক্ষ থেকে ওই জমি বুঝে নেওয়ার কারণে তার স্বজনরা ক্ষুব্ধ হয়েছেন এবং তাকে লোহাগাড়ায় তাদের পৈতৃক ভিটাবাড়িতে পর্যন্ত ঢুকতে দিচ্ছেন না।
অপরদিকে ২য় পক্ষের পরিচালক জামাল উদ্দিন চুক্তির শর্ত উল্লেখ করে বলেন, চুক্তির নিয়ম অনুযায়ী, ১ম পক্ষ তার কেনা ‘আর/২৭৯’ নং হোল্ডিংয়ের ৪ একর জমি ২য় পক্ষকে ছেড়ে দিয়েছেন।
এর বিনিময়ে ২য় পক্ষ আব্দু সোবহানের ওয়ারিশদের কাছ থেকে কেনা ‘৩০৩ নং ডলুছড়ি’ মৌজার (আর/৫৯ নং হোল্ডিং) দুটি দলিল সূত্রে পাওয়া মোট ৩.৭৫ (তিন একর ৭৫ শতক) জমি ১ম পক্ষকে দখল বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, চুক্তিতে স্পষ্ট বলা আছে; এই এওয়াজ-বদল করা জমি শান্তিপূণভাবে ভোগদখল করতে গিয়ে যদি কোনো ৩য় পক্ষ বাধা দেয়, তবে তার সমস্ত দায়ভার আমরা ২য় পক্ষ বহন করব এবং ১ম পক্ষ যদি বৃক্ষচারার বাবদ নেওয়া সাড়ে চার লাখ টাকা ফেরত দেয়, তবে তারা জমিটি পুনরায় নিজেদের দখলে নিতে পারবে, এতে আমরা আপত্তি করবোনা।
ফজিয়া ইসলামে ফার্মের অনেকগুলো নারীপুরুষ শ্রমিক কর্মচারীরা অভিযোগ করে বলেন, ইসমাইল একজন চরম উগ্রস্বভাবের মানুষ, কথায় কথায় তেড়ে আসে। সে সকাল দুপুর বিকাল ও রাতে, একেক সময় একেক অজুহাত খাড়া করে তাদের স্বাভাবিক কর্মকান্ড বাঁধাগ্রস্ত করে চলছে।
মোঃ ইউছুপ আলী শাহরাজ: 



















