
পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম ও বিদ্যুৎ সুবিধাবঞ্চিত এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্প্রসারণ এবং বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা আধুনিকায়নে বড় ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান সরকার। খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান জেলায় বিদ্যুৎ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে ২ হাজার ৯১০ কোটি ২২ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প অনুমোদন করেছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)।
২৯ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ কক্ষে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এটি একনেকের চতুর্থ সভা। একই সভায় মোট ১৫ হাজার ৮২৩ কোটি ৫৭ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৩টি উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়।
এই প্রকল্পের মাধ্যমে দুর্গম পাহাড়ে পৌঁছাবে বিদ্যুৎ। অনুমোদিত প্রকল্পের প্রধান উদ্দেশ্য পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম ও বিদ্যুৎ সুবিধাবঞ্চিত এলাকায় বিদ্যুৎ বিতরণ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করা। পাশাপাশি বিদ্যমান বিদ্যুৎ অবকাঠামোর সক্ষমতা বৃদ্ধি ও বিতরণ ব্যবস্থা আধুনিকায়নের মাধ্যমে গ্রাহকদের নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পটি ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। এর আওতায় তিন পার্বত্য জেলার মোট ২৬টি দুর্গম উপজেলায় বিদ্যুৎ বিতরণ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) পার্বত্য চট্টগ্রামের বিদ্যুৎব্যবস্থা উন্নয়নে ১৭ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার ঋণ অনুমোদন করেছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে তিন পার্বত্য জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে অন্তত ৮৮ হাজার নতুন পরিবার বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আসতে পারে বলে প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
গ্রিড বিদ্যুতের আওতা বাড়ানোর লক্ষ্য জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুতায়নের হার প্রায় ৯৯ শতাংশ হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম ও ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন এলাকাগুলোতে গ্রিডভিত্তিক বিদ্যুৎ সুবিধার আওতা তুলনামূলকভাবে কম।
এডিবির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে খাগড়াছড়িতে প্রায় ৪৯ শতাংশ, রাঙামাটিতে ৪৩ শতাংশ এবং বান্দরবানে ৪১ শতাংশ মানুষ গ্রিড বিদ্যুতের আওতায় রয়েছে। নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে ২০৩২ সালের মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামে গ্রিডভিত্তিক বিদ্যুতের আওতা ৬৮ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এর আওতায় বান্দরবানে বাড়বে বিদ্যুৎ সুবিধার সুযোগ।বান্দরবানের বিস্তীর্ণ পাহাড়ি এলাকা দুর্গম হওয়ায় বিদ্যুৎ অবকাঠামো নির্মাণ ও সংযোগ সম্প্রসারণ দীর্ঘদিন ধরেই বড় চ্যালেঞ্জ। জেলার বিভিন্ন প্রত্যন্ত ইউনিয়ন ও গ্রামে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ পৌঁছানো কঠিন হওয়ায় অনেক পরিবারকে বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হয়।
নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে বিদ্যুৎ বিতরণ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন করা হলে এসব দুর্গম এলাকায় বিদ্যুৎ সুবিধা বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে। এর ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, কৃষি, ক্ষুদ্র ব্যবসা, পর্যটনসহ স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়তে পারে।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যুৎ সুবিধা সম্প্রসারণের পাশাপাশি প্রত্যন্ত পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবীকা, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নেও প্রকল্পটি ভূমিকা রাখবে।
পাহাড়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিরও সুযোগ বাড়বে। পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগোলিক বাস্তবতায় যেসব দুর্গম ও বিচ্ছিন্ন এলাকায় প্রচলিত গ্রিড সম্প্রসারণ কঠিন, সেখানে ভবিষ্যতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের সুযোগও রাখা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সৌরবিদ্যুৎ ও পিকো-হাইড্রোপাওয়ারের মতো প্রযুক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনার কথা প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া কমিউনিটি সংগঠনের মাধ্যমে পরিচালিত অন্তত ৩০টি সৌরবিদ্যুৎচালিত নিরাপদ পানির ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে এডিবি।
উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইতিবচাক প্রভাব কাজ করবে।সংশ্লিষ্টদের মতে, পাহাড়ি অঞ্চলের ভৌগোলিক বৈচিত্র্য ও দুর্গমতার কারণে সমতল এলাকার তুলনায় বিদ্যুৎ অবকাঠামো নির্মাণ ও সম্প্রসারণ বেশি ব্যয়বহুল এবং জটিল। পরিকল্পিতভাবে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করা গেলে দীর্ঘদিন বিদ্যুৎ সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর কাছে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হবে।
বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়লে প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার সুযোগ, স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার, ক্ষুদ্র শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্য এবং পর্যটন খাতেও ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে প্রকল্পের আওতায় বান্দরবানের কোন কোন ইউনিয়ন বা গ্রামে কত কিলোমিটার বিদ্যুৎ লাইন নির্মাণ, কতটি সাবস্টেশন বা ট্রান্সফরমার স্থাপন করা হবে; সে বিষয়ে স্থানভিত্তিক বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশিত হয়নি। ফলে নির্দিষ্ট এলাকা বা অবকাঠামোর সংখ্যা অনুমান করে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা সম্ভব হয়নি।
নিজস্ব সংবাদদাতা: 









