
হিমেল হাওয়া আর কুয়াশা ভেজা সকাল মানেই শীতের আগমনী বার্তা। আর শীতের এই আমেজে বাঙালির রন্ধনশিল্পে এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো সুস্বাদু ডালের বড়ি। শীতের শুরু থেকেই গাইবান্ধার কয়েকটি গ্রামের প্রায় পাঁচ শতাধিক পরিবার মাসকলাই ডালের বড়ি তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। পৈত্রিক পেশা আর ঐতিহ্যের টানে চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও এই পেশা আঁকড়ে ধরে রেখেছেন কারিগররা। স্থানীয় কারিগরদের বিশ্বাস, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই সুস্বাদু বড়ি দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও রপ্তানি করা সম্ভব।
গাইবান্ধা সদর উপজেলার খামার বোয়ালী, লক্ষ্মীপুর, দাড়িয়াপুর, নতুনবন্দর বাজার, সাঘাটা উপজেলার উজিরের বাইগুনি এবং সুন্দরগঞ্জের হরিপুর ও তারাপুরসহ বেশ কয়েকটি গ্রামের প্রান্তিক ও সংখ্যালঘু পরিবারে বংশপরম্পরায় তৈরি হচ্ছে এই বড়ি। বিশেষ করে গাইবান্ধা সদর উপজেলার খামার বোয়ালী গ্রামের কারিগরদের সুনাম রয়েছে বেশ।
গ্রামের নারীদের পাশাপাশি পুরুষ ও শিক্ষার্থীরাও পড়াশোনার ফাঁকে এই কাজে সহায়তা করেন। শীতকালে কাজের চাপ এতটাই বাড়ে যে দম ফেলার সময় থাকে না। কারিগরদের দৈনন্দিন রুটিন শুরু হয় কাকডাকা ভোরে। নিয়ম অনুযায়ী, আগের রাতে ডাল মেশিনে বা যাতায় পিষে তা ভিজিয়ে রাখতে হয়। সকালে সেই ডাল ভালোভাবে ফেটিয়ে মণ্ড তৈরি করে ছোট ছোট বড়ির আকারে বাঁশের চালা কিংবা কাপড়ের ফ্রেমে রোদে শুকাতে দেওয়া হয়। দুই থেকে তিন দিন রোদে শুকানোর পরেই বিক্রির উপযোগী হয় এই বড়ি। দেখতে সুন্দর ও সুস্বাদু হওয়ায় এসব বড়ির কদর রয়েছে দেশজুড়ে।
সারাবছর কম-বেশি বড়ি তৈরি হলেও শীত এলেই এর চাহিদা তুঙ্গে পৌঁছে। মানসম্মত হওয়ায় অনেক কারিগরকে হাট-বাজারে যেতে হয় না; পাইকাররা বাড়ি থেকেই বড়ি কিনে নিয়ে যান। অনেক সময় আত্মীয়-স্বজনের হাত ধরে গাইবান্ধার এই ডালের বড়ি পৌঁছে যায় বিদেশেও বসবাসকারী প্রবাসীদের ডাইনিংয়ে। প্রতিদিন গড়ে ৮ থেকে ১০ কেজি বড়ি বিক্রি করেন অনেকে।
বর্তমানে ডালের বড়ির চাহিদা আকাশচুম্বী হলেও উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি আর চড়া বাজারের কারণে লাভের মুখ দেখতে পারছেন না কারিগররা। জীবন বাঁচাতেই তাদের এই সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হচ্ছে।
হিসাব কষে দেখা যায়, এই শুকনো বড়ি পাইকারি বাজারে ২০০ টাকা থেকে ২৫০ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়। এতে সব খরচ বাদ দিয়ে প্রতিদিন মাত্র ৭০০ থেকে ১০০০ টাকা লাভ থাকে, যা দিয়ে বড়জোর দিন আনে দিন খায় গোছের সংসার চলে।
খামার বোয়ালী গ্রামের কারিগররা আক্ষেপ করে জানান, “আগে মাসকলাই ডালের দাম কম থাকায় ভালো লাভ হতো। এখন সবকিছুর দাম বেড়ে যাওয়ায় কুলিয়ে উঠতে পারছি না। বড়ি বিক্রি করে কেবল পেটে-ভাতে দিন চলে। যদি সরকারিভাবে সহজ শর্তে আর্থিক সহযোগিতা পেতাম, তবে ব্যবসাটি আরও বড় করতে পারতাম।”
বোয়ালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সহিদুল ইসলাম সাবু বলেন, “আমাদের ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামের সংখ্যালঘু পল্লীতে শীতের আগে থেকেই ডাল কিনে বড়ি তৈরি করে রোদে শুকিয়ে ঘরে মজুত করা হয়। শীত এলেই স্থানীয় পাইকারসহ দূর-দূরান্ত থেকে ব্যবসায়ীরা এসে বড়ি কিনে নিয়ে যান।”
ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (বিসিক)। আব্দুল্লাহ আল ফেরদৌস সহকারি মহাব্যবস্থাপক,বিসিক,গাইবান্ধা জানান, গাইবান্ধার ডালের বড়ির মান খুবই ভালো এবং এর ক্রেতাও প্রচুর। কারিগরদের আর্থিক সহযোগিতার প্রয়োজন হলে বিসিক সবসময় তাদের পাশে থাকবে এবং প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা প্রদান করবে।
ঐতিহ্যবাহী এই কুটির শিল্পটি টিকিয়ে রাখতে এবং প্রান্তিক কারিগরদের মুখে হাসি ফোটাতে সরকারি প্রণোদনা ও সহজ ঋণ সুবিধা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
নিজস্ব প্রতিবেদক, গাইবান্ধা 




















