Lama ০৯:৪৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ২০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
নিজেই আর্থিক অনটনের সঙ্গে লড়াই করলেও শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গড়ার প্রত্যয়ে বুকে ধারণ

নিজের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, তবুও লামার পাহাড়ি শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়ছেন অথোয়ই মারমা

বান্দরবানের লামা উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি জনপদ বনপুর রাজাপাড়ায় শিক্ষার্থীদের পাঠদান করে চলেছেন অথোয়ই মারমা। নিজেই আর্থিক অনটনের সঙ্গে লড়াই করলেও শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গড়ার প্রত্যয়ে প্রতিদিন প্রায় চার কিলোমিটার পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে বিদ্যালয়ে যান তিনি। তবে শিক্ষকতা করেও মাসে তাঁর আয় ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকার মধ্যে।

অথোয়ই মারমা লামা উপজেলার ৩নং ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের ত্রিশড্রেবা পাড়ার বাসিন্দা। পিতা ক্যচিং মারমা ও মাতা চোছা মারমার তৃতীয় সন্তান তিনি।

রামতুইপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন অথোয়ই। এরপর পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে তাঁকে কুমিল্লার জ্যোতিঃপাল মহাথের বৌদ্ধ অনাথ আশ্রম উচ্চবিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হয়। সেখানেই তাঁর শৈশবের একটি বড় সময় কেটে যায়।

দারিদ্র্যের মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে যান তিনি। এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৪.৩৯ এবং ডুলাহাজারা ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ২.৩৩ অর্জন করেন। পড়াশোনার পাশাপাশি পরিবারের সহযোগিতায় রাবার বাগানে গাছ কাটার কাজ ও কৃষিকাজও করেছেন তিনি।

গয়াল মারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রামতূই পারা সরকার প্রথামিক বিদ্যালয়,বনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ইংছা পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সহ আরো তাহেরিয়াসুন্নিয়া মাদ্রাসা সহ একাধিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে একমাত্র উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার মাধ্যম বনপুর সংগু বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় বিদ্যালয়ে চাকরি করেন

বলেন, তাঁর এলাকায় পড়াশোনার উপযুক্ত পরিবেশ ছিল না। এ কারণে তাঁকে অনাথ আশ্রমে গিয়ে পড়াশোনা করতে হয়েছে। একসময় তাঁর বাবা ক্যচিং মারমা তাঁকে আর পড়াশোনা না করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তখন বাবাকে তিনি বলেছিলেন, পড়ালেখা না করলে জঙ্গলে যেমন বন ও প্রাণীরা নিজেদের মতো চলে, আমাদের জীবনও তেমন হয়ে যাবে। আমার পড়ালেখা করতে হবে। আমি মানুষের মতো মানুষ হওয়ার চেষ্টা করব।

২০২৩ সাল থেকে বনপুর সাংগু মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে শিক্ষকতা করছেন অথোয়ই মারমা। প্রতিদিন প্রায় চার কিলোমিটার পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে সকাল ৯টার মধ্যে বিদ্যালয়ে পৌঁছান তিনি। বিকেল ৩টা পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের পাঠদান শেষে আবারও দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে বাড়ি ফেরেন।

নিজের বর্তমান জীবনযাপন সম্পর্কে অথোয়ই মারমা বলেন, সংসার চালাতে তাঁকে অনেক কষ্ট করতে হচ্ছে। তাঁর এলাকার অনেক মানুষও নানা প্রতিকূলতার মধ্যে জীবনযাপন করছেন। সেই বাস্তবতা থেকেই তিনি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার প্রতি উৎসাহিত করার চেষ্টা করেন।

অথোয়ই মারমা বলেন মাস শেষে কখনো ৫০০ টাকা, আবার কখনো ১ হাজার টাকা পান। এই সামান্য আয় দিয়ে মা-বাবার খরচ চালাতেও তাঁকে হিমশিম খেতে হয়। পাহাড়ে মেধাবী শিক্ষার্থীদের ধরে আনতে নির অলস ভাবে কাজ করে যাবে নিতি।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. সাদ্দাম হোসেন বলেন, বিদ্যালয়ের ক্লাস শেষে শিক্ষকরা সংসার চালাতে বিভিন্ন কাজে যুক্ত হন। কেউ গরুর খামারে কাজ করেন, আবার কেউ বাগানে শ্রম দেন।

দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও শিক্ষকতা চালিয়ে যাচ্ছেন অথোয়ই মারমা। নিজের আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও শিক্ষার্থীদের পাঠদানে নিয়মিত তিনি। তবে স্বল্প পারিশ্রমিকে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করা এই ধরনের শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

Popular Post

কর্ণফুলীতে বিতর্ক উৎসবের উদ্বোধন, দিনব্যাপী কর্মশালা সম্পন্ন

Bandarban Tribune

নিজেই আর্থিক অনটনের সঙ্গে লড়াই করলেও শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গড়ার প্রত্যয়ে বুকে ধারণ

নিজের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, তবুও লামার পাহাড়ি শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়ছেন অথোয়ই মারমা

Update Time : ০৮:১১:০৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬

বান্দরবানের লামা উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি জনপদ বনপুর রাজাপাড়ায় শিক্ষার্থীদের পাঠদান করে চলেছেন অথোয়ই মারমা। নিজেই আর্থিক অনটনের সঙ্গে লড়াই করলেও শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গড়ার প্রত্যয়ে প্রতিদিন প্রায় চার কিলোমিটার পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে বিদ্যালয়ে যান তিনি। তবে শিক্ষকতা করেও মাসে তাঁর আয় ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকার মধ্যে।

অথোয়ই মারমা লামা উপজেলার ৩নং ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের ত্রিশড্রেবা পাড়ার বাসিন্দা। পিতা ক্যচিং মারমা ও মাতা চোছা মারমার তৃতীয় সন্তান তিনি।

রামতুইপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন অথোয়ই। এরপর পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে তাঁকে কুমিল্লার জ্যোতিঃপাল মহাথের বৌদ্ধ অনাথ আশ্রম উচ্চবিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হয়। সেখানেই তাঁর শৈশবের একটি বড় সময় কেটে যায়।

দারিদ্র্যের মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে যান তিনি। এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৪.৩৯ এবং ডুলাহাজারা ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ২.৩৩ অর্জন করেন। পড়াশোনার পাশাপাশি পরিবারের সহযোগিতায় রাবার বাগানে গাছ কাটার কাজ ও কৃষিকাজও করেছেন তিনি।

গয়াল মারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রামতূই পারা সরকার প্রথামিক বিদ্যালয়,বনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ইংছা পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সহ আরো তাহেরিয়াসুন্নিয়া মাদ্রাসা সহ একাধিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে একমাত্র উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার মাধ্যম বনপুর সংগু বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় বিদ্যালয়ে চাকরি করেন

বলেন, তাঁর এলাকায় পড়াশোনার উপযুক্ত পরিবেশ ছিল না। এ কারণে তাঁকে অনাথ আশ্রমে গিয়ে পড়াশোনা করতে হয়েছে। একসময় তাঁর বাবা ক্যচিং মারমা তাঁকে আর পড়াশোনা না করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তখন বাবাকে তিনি বলেছিলেন, পড়ালেখা না করলে জঙ্গলে যেমন বন ও প্রাণীরা নিজেদের মতো চলে, আমাদের জীবনও তেমন হয়ে যাবে। আমার পড়ালেখা করতে হবে। আমি মানুষের মতো মানুষ হওয়ার চেষ্টা করব।

২০২৩ সাল থেকে বনপুর সাংগু মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে শিক্ষকতা করছেন অথোয়ই মারমা। প্রতিদিন প্রায় চার কিলোমিটার পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে সকাল ৯টার মধ্যে বিদ্যালয়ে পৌঁছান তিনি। বিকেল ৩টা পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের পাঠদান শেষে আবারও দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে বাড়ি ফেরেন।

নিজের বর্তমান জীবনযাপন সম্পর্কে অথোয়ই মারমা বলেন, সংসার চালাতে তাঁকে অনেক কষ্ট করতে হচ্ছে। তাঁর এলাকার অনেক মানুষও নানা প্রতিকূলতার মধ্যে জীবনযাপন করছেন। সেই বাস্তবতা থেকেই তিনি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার প্রতি উৎসাহিত করার চেষ্টা করেন।

অথোয়ই মারমা বলেন মাস শেষে কখনো ৫০০ টাকা, আবার কখনো ১ হাজার টাকা পান। এই সামান্য আয় দিয়ে মা-বাবার খরচ চালাতেও তাঁকে হিমশিম খেতে হয়। পাহাড়ে মেধাবী শিক্ষার্থীদের ধরে আনতে নির অলস ভাবে কাজ করে যাবে নিতি।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. সাদ্দাম হোসেন বলেন, বিদ্যালয়ের ক্লাস শেষে শিক্ষকরা সংসার চালাতে বিভিন্ন কাজে যুক্ত হন। কেউ গরুর খামারে কাজ করেন, আবার কেউ বাগানে শ্রম দেন।

দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও শিক্ষকতা চালিয়ে যাচ্ছেন অথোয়ই মারমা। নিজের আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও শিক্ষার্থীদের পাঠদানে নিয়মিত তিনি। তবে স্বল্প পারিশ্রমিকে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করা এই ধরনের শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।