
দুর্গম পাহাড়ে জন্ম, চারপাশে অভাব-অনটন আর চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতা। শৈশবেই চিকিৎসার অভাবে বোনকে হারানো এবং মায়ের দীর্ঘদিনের অসুস্থতা তার মনে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন জাগায়। সেই স্বপ্ন পূরণে পেরোতে হয়েছে নানা বাধা। অদম্য ইচ্ছাশক্তি, বাবার প্রচেষ্টা ও অনেকের সহযোগিতায় শেষ পর্যন্ত চিকিৎসক হয়েছেন সংচাং ম্রো। দুর্গম পাহাড়ের ম্রো জনগোষ্ঠীর পরিবার থেকে উঠে আসা প্রথম নারী চিকিৎসক হিসেবে তিনি এখন অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণা।
২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, বান্দরবান জেলায় ম্রো জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যা প্রায় ৫৩ হাজার। জেলার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে জনসংখ্যার দিক থেকে তারা দ্বিতীয় বৃহত্তম। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় বসবাস করায় এ জনগোষ্ঠীর অনেক মানুষের কাছে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, যোগাযোগ ও আধুনিক চিকিৎসাসেবা এখনো সহজলভ্য নয়। এমন বাস্তবতার মধ্যেই সংচাং ম্রোর চিকিৎসক হয়ে ওঠার গল্পটি হয়ে উঠেছে সম্ভাবনা ও সংগ্রামের এক অনন্য উদাহরণ।
সংচাং ম্রোর বাড়ি বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার সদর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের পাইয়া কারবারি পাড়ায়। তার বাবা কাইংপ্রে ম্রো এবং মা তুমলেং ম্রো। পরিবারের দুঃখ-কষ্ট কাছ থেকে দেখেই চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন বুনেছিলেন তিনি।
শৈশব থেকেই সংগ্রামের শুরু:
সংচাং ম্রোর পড়াশোনার হাতেখড়ি বাবার কাছে। জুমচাষের কাজের ফাঁকে বাবা কখনো মাটিতে, কখনো কলাপাতায় অক্ষর লিখে তাকে পড়াতেন। চিকিৎসার অভাবে এক মেয়েকে হারানো এবং স্ত্রীর দীর্ঘদিনের অসুস্থতা বাবাকে সন্তানদের মধ্যে অন্তত একজনকে চিকিৎসক হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখায়।
গ্রামে বিদ্যালয় না থাকায় মেয়েকে পড়াশোনার জন্য বাড়ি থেকে দূরের লামা মিশন হোস্টেলে ভর্তি করান কাইংপ্রে ম্রো। পরে সেই হোস্টেল বন্ধ হয়ে গেলে ফাদার লুপির পরিচালিত তৈদাং হোস্টেলে ভর্তি করানো হয় তাকে। সেখানে থেকে চম্পটপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও আলীকদম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন সংচাং। পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তিও পান তিনি।
অভাবের সঙ্গে লড়াই করে এগিয়ে চলা:
আলীকদমে বিজ্ঞানের উপযুক্ত শিক্ষক না থাকায় উচ্চশিক্ষার জন্য তাকে যেতে হয় সেন্ট যোসেফস হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজে। আর্থিক সংকটের মধ্যেও শিক্ষক, শিক্ষিকা ও সিস্টারদের সহযোগিতায় চলতে থাকে তার পড়াশোনা।
এসএসসি পরীক্ষার পর হলিক্রস কলেজে ভর্তির সুযোগ পেলেও অর্থের অভাবে ভর্তি হতে পারেননি সংচাং। সেই সময়ের কথা স্মরণ করে তিনি জানান, ভর্তি হতে না পেরে অনেক কেঁদেছিলেন। পরে নমিতা সিস্টার তাকে আবার কলেজে নিয়ে যান এবং বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ করে দেন। কলেজের অন্য শিক্ষকেরাও বিনা মূল্যে পড়িয়েছেন। মেরি মার্গারেট সিস্টার মাঝেমধ্যে হাতখরচও দিতেন।
এইচএসসি পরীক্ষার পরও আর্থিক সংকট তার পিছু ছাড়েনি। বাসায় না ফিরে কলেজে থেকেই দুই ভাই-বোনকে পড়াতেন তিনি। সেই টাকায় মেডিকেলে ভর্তির প্রস্তুতি নিতে থাকেন। বাবা তাকে বাড়ি ফিরে চাকরির পরীক্ষায় অংশ নিতে বললেও সংচাং সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। কোথাও ভর্তির সুযোগ না পাওয়া পর্যন্ত বাড়ি ফিরবেন না—এমন প্রতিজ্ঞা করেছিলেন তিনি।
অবশেষে আসে সেই কাঙ্ক্ষিত দিন। রাঙামাটি মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পান সংচাং ম্রো। তার ভাষায়, জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিন ছিল সেটি। প্রায় তিন বছর পর বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নেন তিনি।
চিকিৎসক হয়ে পাহাড়ের মানুষের পাশে থাকার স্বপ্ন:
রাঙামাটি মেডিকেল কলেজে ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের চতুর্থ ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন সংচাং ম্রো। চিকিৎসাবিজ্ঞানের পড়াশোনা শেষ করে বর্তমানে ওই কলেজেই ইন্টার্ন চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।
মেডিকেলে ভর্তির পর বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ক্যশৈহ্লা, সুবর্ণা ভূমি ফাউন্ডেশন, বিএসএসবির কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান তাকে সহযোগিতা করেছেন। সিনিয়র ভাই-বোনেরাও বই-খাতা ও বৃত্তি দিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন।
নিজের দীর্ঘ সংগ্রামের অভিজ্ঞতা থেকে সংচাং ম্রো চান, পাহাড়ের মানুষ যেন আর চিকিৎসার অভাবে প্রাণ না হারায়। দুর্গম এলাকার মানুষের জন্য উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার স্বপ্ন দেখেন তিনি।
আলীকদম-নাইক্ষ্যংছড়ি ম্রো কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক থং প্রে ম্রো বলেন, সংচাং ম্রো জনগোষ্ঠীর প্রথম নারী চিকিৎসক। তার এই অর্জন ম্রো জনগোষ্ঠীর জন্য আশীর্বাদস্বরূপ।
অভাব-অনটন আর দুর্গম পাহাড়ের সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে সংচাং ম্রোর এই অর্জন শুধু একটি পরিবারের স্বপ্নপূরণ নয়; এটি পাহাড়ের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর মেয়েদের জন্যও নতুন সম্ভাবনার বার্তা। তার পথচলা প্রমাণ করে, সুযোগ ও সহযোগিতা পেলে দুর্গম পাহাড়ের মেয়েরাও নিজেদের স্বপ্ন পূরণ করতে পারেন।
নিজস্ব প্রতিবেদক: 















