
পার্বত্য জেলা বান্দরবানে গত তিন বছর ধরে ইটভাটার কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। অথচ পার্শ্ববর্তী অন্য জেলাগুলোতে ইটভাটা চালু রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ভাটাগুলো বন্ধ থাকায় উন্নয়ন অগ্রগামী এই জেলার অন্তত ৫০ হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন। দেখা দিয়েছে চরম ইটসংকট, যার প্রভাবে থমকে গেছে স্থানীয় সরকারি ও বেসরকারি খাতের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কার্যক্রম।
স্থানীয় শ্রমিক ও ইটভাটা মালিক সমিতির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মৌসুমভিত্তিক এই কাজের ওপর হাজার হাজার শ্রমিকের পরিবার জীবিকা নির্ভর করে। কিন্তু দীর্ঘ স্থবিরতায় তাঁদের জীবন এখন গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
বেকারত্বের কবলে ৫০ হাজার শ্রমিক:
বান্দরবান জেলা ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি আবদুল কুদ্দুস জানান, জেলার সাতটি উপজেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৭০টি ইটভাটা রয়েছে। এর মধ্যে শুধু লামা উপজেলাতেই রয়েছে প্রায় ৪০টি। এসব ভাটায় পাহাড়ি ও বাঙালি মিলিয়ে প্রায় ৫০ হাজার শ্রমিক সরাসরি কাজ করেন। এর বাইরে পরিবহন, মালামাল সরবরাহ ও আনুষাঙ্গিক কাজের সঙ্গে আরও প্রায় ১৫ হাজার মানুষ পরোক্ষভাবে জড়িত। ভাটাগুলো বন্ধ থাকায় এসব মানুষের আয়-উপার্জন বন্ধ হয়ে গেছে।
ভাটার শ্রমিক হাবিবুল্লাহ, আলাউদ্দীন, নূরুল আলম ও সাইফুল জানান, প্রতিবারের মতো এবারও মৌসুমের কাজের আশায় তাঁরা বিভিন্ন জায়গা থেকে দাদন বা ঋণ নিয়ে কিংবা ধারদেনা করে পারিবারিক খরচ মিটিয়েছেন। কেউ কেউ মালিকদের কাছ থেকে অগ্রিম অর্থ নিয়েও তা সংসারে ব্যয় করেছেন। কিন্তু এখনো ভাটাগুলো চালু না হওয়ায় এই ঋণ পরিশোধ ও পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয় মেটানো তাঁদের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় দ্রুত বিকল্প কর্মসংস্থান অথবা ইটভাটা চালুর সুযোগ সৃষ্টির দাবি জানিয়েছেন এইসব শ্রমিকরা।
আকাশচুম্বী ইটের দাম, স্থবির উন্নয়নকাজ:
ইটভাটা বন্ধ থাকায় বান্দরবানে দেখা দিয়েছে তীব্র ইটসংকট। স্থানীয়ভাবে ইট তৈরি না হওয়ায় জেলার বাইরে সমতল কোনো জেলা থেকে অতিরিক্ত পরিবহন খরচ দিয়ে ইট আনতে হচ্ছে। এতে নির্মাণসামগ্রীর দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। ফলে সড়ক, ভবন ও বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়নমূলক কাজ প্রায় থমকে গেছে। ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে নির্মাণকাজ চালিয়ে যাওয়া অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও দুরূহ হয়ে পড়েছে।
মালিকপক্ষের উদ্বেগ ও দাবি:
ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি আবদুল কুদ্দুস বলেন, “বান্দরবানের উৎপাদিত ইট দিয়েই স্থানীয় সরকারি ও বেসরকারি সব ধরনের নির্মাণকাজ মেটানো হতো। কিন্তু গত তিন বছর ধরে ভাটাগুলো বন্ধ থাকায় আমাদের বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়তে হয়েছে। সমতল জেলা থেকে অতিরিক্ত পরিবহন খরচে ইট এনে কাজ করা অসম্ভব। তাই স্থানীয় অর্থনীতি ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সচল রাখতে যথাযথ কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করছি।”
স্থানীয় সচেতন মহল ও ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, পাহাড়ের পরিবেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিয়ম মেনে নির্ধারিত আইনি কাঠামোর মধ্যে থেকে বিকল্প উপায়ে ভাটা চালুর বা সংকট সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া না হলে জেলার অর্থনীতি আরও গভীর সংকটের মুখে পড়বে।
শ্রমিক মামুন বলেন,”আমাদের পাশ্ববর্তী সমতলের উপজেলাগুলোতে ইট তৈরির কাজ চলছে। কিন্তু কর্মসংস্থানহীন পাহাড়ি জেলা বান্দরবানের সব চেয়ে বেশি জনবহুল উপজেলায় তথা বান্দরবানে কেনো ইট তৈরি করা যাচ্ছেনা। যার ফলে এই পেশায় অভ্যস্ত আমরা সাধারণ দিনমজুর শ্রমিকরা চরম সংকটে পড়েছি।”
শ্রমিক মোঃ ইসমাইল, আমির আলী, জাফর আলম বলেন,”হয় বিকল্প কর্মসংস্থান বা রেশন প্রদান করা না হয় ইটভাটা চালু না হলে আমরা স্ত্রী সন্তান বৃদ্ধ বাবা মা ভাই বোন নিয়ে না খেয়ে থাকতে হবে।” এসব শ্রমিকরা সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন।
নিজস্ব সংবাদদাতা: 


















