
ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ, সম্প্রীতি ও উন্নয়নের স্বপ্নে এগিয়ে চলা এক সম্ভাবনাময় উপজেলা
——–এম রুহুল আমিন, সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী
বান্দরবান জেলার সবুজ পাহাড়, আঁকাবাঁকা মাতামুহুরী নদী এবং বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির অপূর্ব মিলনে গড়ে ওঠা লামা উপজেলা আজ পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জনপদ। আয়তনের দিক থেকে জেলার দ্বিতীয় বৃহত্তম এই উপজেলা শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যই নয়, বরং ইতিহাস, ঐতিহ্য, মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাথা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কারণে বিশেষ পরিচিতি লাভ করেছে।
একটি পৌরসভা ও সাতটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত লামা বর্তমানে অর্থনীতি, শিক্ষা, পর্যটন ও সাংস্কৃতিক বিকাশের নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করছে। বাঙালি, মার্মা, ম্রো, ত্রিপুরা, চাকমা, বমসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এ জনপদকে দিয়েছে অনন্য বৈশিষ্ট্য।
নামকরণের পেছনের ইতিহাস:
লামা নামের উৎপত্তি নিয়ে স্থানীয়ভাবে একাধিক কিংবদন্তি প্রচলিত রয়েছে। প্রবীণ মার্মা জনগোষ্ঠীর মতে, ‘হ্লামা’ শব্দ থেকে ‘লামা’ নামের উৎপত্তি হয়েছে। মার্মা ভাষায় ‘হ্লামা’ অর্থ সুন্দরী নারী। জনশ্রুতি আছে, সপ্তদশ শতকে বার্মা থেকে আগত এক কুমারী নারী বর্তমান বিলছড়ি এলাকায় এসে মহামুনি বৌদ্ধ বিহার প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর সৌন্দর্য, ব্যক্তিত্ব ও মানবিক গুণাবলীর কারণে এলাকাটি ‘হ্লামা’ নামে পরিচিতি পায়, যা পরবর্তীতে ‘লামা’তে রূপ নেয়।
অন্যদিকে স্থানীয় লোককথায় বলা হয়, মাতামুহুরী নদীর তীরবর্তী এলাকায় ‘আহলামা’ নামের এক প্রভাবশালী মার্মা নারীর বসবাস ছিল। তাঁর নাম অনুসারেই ‘আহলামা’ থেকে ‘লামা’ নামের উৎপত্তি হয়েছে বলে অনেকের বিশ্বাস।
প্রাচীন বসতি ও প্রশাসনিক বিবর্তন
ইতিহাসবিদদের মতে, ১৭৮২ সালে আরাকানে বার্মিজ আক্রমণের পর বহু মার্মা পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে বর্তমান লামা অঞ্চলে এসে বসতি স্থাপন করে। মাতামুহুরী নদীকেন্দ্রিক কৃষি, বাণিজ্য ও জনবসতির মাধ্যমে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে আধুনিক লামা।
ব্রিটিশ শাসনামলে প্রশাসনিক গুরুত্ব বিবেচনায় ১৯২৩ সালে লামা থানা প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে লামার প্রশাসনিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রচিত হয় ১৯৭৯ সালে। সে সময় রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান লামা সফর করেন এবং ৯ অক্টোবর লামা, আলীকদম, নাইক্ষ্যংছড়ি, গজালিয়া ও বাইশারী থানা কে নিয়ে লামা মহকুমা ঘোষণা করেন।
পরবর্তীতে প্রশাসনিক পুনর্গঠনের সময় স্বল্প সময়ের জন্য লামাকে জেলা হিসেবে ঘোষণার আলোচনা ও কার্যক্রম শুরু হলেও পরে তা বাতিল করে উপজেলায় রূপান্তর করা হয়। ১৯৮৫ সালে লামা পূর্ণাঙ্গ উপজেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। বর্তমানে প্রায় ৬৭১.৮৪ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ উপজেলা বান্দরবানের অন্যতম জনগুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ইউনিট।
মহান মুক্তিযুদ্ধে লামার অবদান
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে লামার জনগণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। পাকবাহিনীর অত্যাচারের বিরুদ্ধে স্থানীয় ছাত্র-জনতা, রাজনৈতিক কর্মী এবং সাধারণ মানুষ সংগঠিত হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
শহীদ আবদুল হামিদ এবং অনারারি ক্যাপ্টেন (অব.) আবদুস সোবহান গং নেতৃত্বে গহীন অরণ্যে প্রশিক্ষণ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। সেখান থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধারা লামা, আলীকদম ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় গেরিলা অভিযান পরিচালনা করে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সাহসিকতার সঙ্গে যুদ্ধ করেন।
মুক্তিযুদ্ধের এই গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস আজও লামাবাসীর অহংকার।
সম্প্রীতির বন্ধনে বহু সাংস্কৃতিক সমাজ
লামার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর সামাজিক সম্প্রীতি। বাঙালিদের পাশাপাশি মার্মা, ম্রো, ত্রিপুরা, চাকমা জনগোষ্ঠী নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করছে।
বৈসাবি, সাংগ্রাই, বুদ্ধ পূর্ণিমা, ওয়ানগালা, দুর্গাপূজা, ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্প্রীতির পরিবেশে উদযাপিত হয়।
ঐতিহ্যবাহী পোশাক, লোকসংগীত, নৃত্য, হস্তশিল্প ও জীবনধারা লামার সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
পর্যটনের অপার সম্ভাবনা
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে লামা এখন দেশের উদীয়মান পর্যটন গন্তব্যগুলোর একটি। পাহাড়, নদী, ঝিরি, অরণ্য ও মেঘের রাজ্যে প্রতিদিনই বাড়ছে পর্যটকের আগমন।
উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থানের মধ্যে রয়েছে; মিরিঞ্জা ভ্যালি, মাতামুহুরী নদী, ফাঁসিয়াখালী রাবার বাগান, লাকপাং ডং পাহাড়, মুরাংজা তাং পাহাড়, মহামুনি বৌদ্ধ বিহার, কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন, হেব্রোন মিশন, জীনামেজু অনাথ আশ্রম ছলমঝিরি কয়লার খনি ইত্যাতি।
বিশেষ করে মিরিঞ্জা ভ্যালি ও মাতামুহুরী নদীকেন্দ্রিক পর্যটন শিল্প স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি করছে।
কৃষি, রাবার ও অর্থনীতির বিকাশ
কৃষি, ফলচাষ, বনজ সম্পদ, রাবার শিল্প ও ক্ষুদ্র ব্যবসা লামার অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি। আম, কাঁঠাল, আনারস, কলা, কাজুবাদামসহ বিভিন্ন ফলের উৎপাদনে এ অঞ্চল সমৃদ্ধ। পাশাপাশি দেশের অন্যতম বৃহৎ রাবার উৎপাদন এলাকা হিসেবেও লামা পরিচিতি লাভ করেছে। পর্যটন শিল্পের সম্প্রসারণ স্থানীয় কর্মসংস্থান ও ব্যবসা-বাণিজ্যের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করছে।
লামার গর্ব: বিশিষ্ট ব্যক্তি ও সমাজনেতা
লামার ইতিহাস ও সমাজ জীবনে অবদান রাখা বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য, প্রয়াত মেরাথোয়াই অং চৌধুরী, আলহাজ মোহাম্মদ আলী মিয়া, মরহুম আবদুল মালেক চৌধুরী
আলহাজ মোহাম্মদ ইসমাইল, এম রুহুল আমিন (সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী), আনোয়ারা বেগম, আমির হোসেন মজুমদার, নাজমুল ইসলাম, নুর আহমদ (পোস্টমাস্টার)
বদরুদ্দোজা চৌধুরী, নুরুল আলম (প্রধান শিক্ষক),আজিজুর রহমান (ঠিকাদার),প্রিয়দর্শী বড়ুয়া (সাংবাদিক ও শিক্ষক),প্রমোদ চন্দ্র বডুয়া (শিক্ষক)।
উন্নয়নের পথে লামা
সড়ক যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও পর্যটন অবকাঠামোর উন্নয়নের ফলে লামা এখন জাতীয় পর্যায়ে অধিক পরিচিত। তবে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পরিবেশ সংরক্ষণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, পর্যটন ব্যবস্থাপনা এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষায় সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
লামাবাসীর প্রাণের দাবি
স্থানীয় জনগণ দীর্ঘদিন ধরে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি উত্থাপন করে আসছেন। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে;
১. সাবেক লামা মহকুমাকে জেলা হিসেবে পুনঃঘোষণা।
২. লামা সরকারি মাতামুহুরী কলেজে অনার্স ও মাস্টার্স কোর্স চালু।
৩. কারিগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রতিষ্ঠা।
৪. সিনিয়র সহকারী জজ আদালত স্থাপন।
৫. আবাসিক উপজাতি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা।
৬. একটি কারাগার স্থাপন।
৭. লামাকে পর্যটন নগরী হিসেবে ঘোষণা।
৮. উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১০০ শয্যায় উন্নীতকরণ।
৯. রাবার শিল্পনগরী হিসেবে লামার স্বীকৃতি।
স্থানীয় পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর মতে, এসব দাবি বাস্তবায়িত হলে লামা শুধু বান্দরবানের নয়, সমগ্র দক্ষিণ-পূর্ব বাংলাদেশের অন্যতম অর্থনৈতিক ও পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে।
উপসংহার:
ইতিহাস, ঐতিহ্য, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সমন্বয়ে লামা একটি অনন্য জনপদ। পরিকল্পিত উন্নয়ন, পরিবেশবান্ধব পর্যটন এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের মাধ্যমে এ উপজেলা ভবিষ্যতে দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন ও অর্থনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।পাহাড়, নদী, সংস্কৃতি ও সম্প্রীতির এক জীবন্ত প্রতীক লামা; যেখানে ইতিহাসের গৌরব আর প্রকৃতির সৌন্দর্য মিলেমিশে সৃষ্টি করেছে সম্ভাবনার এক নতুন দিগন্ত।
Reporter Name 















