
খুলনার কয়রায় দুই দশকের বেশি সময় ধরে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে মোহাম্মাদিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়, প্রয়োজন পাকা ভবন ও সরকারি সহায়তা।
সকাল ১০টা। বিদ্যালয়ের মাঠে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে ২২১ শিক্ষার্থী। চলছে শারীরিক কসরত (পিটি প্যারেড)। এরপর জাতীয় সংগীত গেয়ে শুরু হয় দিনের পাঠদান। বাইরে থেকে দেখলে আর দশটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মতোই মনে হবে প্রতিষ্ঠানটিকে। তবে শ্রেণিকক্ষে ঢুকলে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র।
চার কক্ষের একটি টিনশেড ঘরে চলছে ২২১ শিক্ষার্থীর পাঠদান। পর্যাপ্ত বেঞ্চ নেই, নেই প্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক পাখা। গরমে শ্রেণিকক্ষে বসে অস্বস্তিতে থাকতে হয় শিক্ষার্থীদের। বর্ষায় টিনের চাল দিয়ে পানি পড়লে ব্যাহত হয় পাঠদান। এরপরও নিয়মিত চলছে পড়াশোনা।
এ চিত্র খুলনার কয়রা উপজেলার মহারাজপুর ইউনিয়নের দেয়াড়া গ্রামের মোহাম্মাদিয়া বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের। প্রত্যন্ত এলাকায় প্রাথমিক বিদ্যালয় না থাকায় স্থানীয় শিশুদের শিক্ষার সুযোগ তৈরি করতে ২০০৫ সালে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন স্থানীয় শিক্ষিত ব্যক্তি জিল্লুর রহমান মামুন।
প্রতিষ্ঠার পর দুই দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে পড়ছে ২২১ শিক্ষার্থী। তাদের পাঠদানের জন্য রয়েছেন ছয়জন শিক্ষক ও একজন কর্মচারী। সম্প্রতি বিদ্যালয়টি নিবন্ধিত বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। তবে নিবন্ধন হলেও শিক্ষকেরা এখনো নিয়মিত বেতন-ভাতা পান না। বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্তও হয়নি।
বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে বিনা বেতনে পাঠদান করছেন তাঁরা। সংসার চালাতে কেউ কেউ শিক্ষার্থীদের টিউশনি করাচ্ছেন। বিদ্যালয়ে পাঠদান ও পরিবারের খরচ চালানো—দুই দায়িত্বই সামলাতে হচ্ছে তাঁদের।
তবে আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও তাঁরা পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছেন। কারণ, এলাকার শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ তৈরিতে বিদ্যালয়টির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী নূসরাত জাহান প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে এ প্লাস পেয়েছিলেন। বর্তমানে তিনি কলেজে পড়াশোনা করছেন। নূসরাত বলেন, ‘আমি এই স্কুল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে এ প্লাস পেয়েছিলাম। আমার ভালো ফলাফলের পেছনে শিক্ষকদের অনেক অবদান রয়েছে।’
স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য, বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার আগে এলাকার অনেক শিশুকে প্রাথমিক শিক্ষার জন্য দূরের বিদ্যালয়ে যেতে হতো। যাতায়াতের অসুবিধাসহ বিভিন্ন কারণে অনেক পরিবারের পক্ষে সন্তানদের নিয়মিত বিদ্যালয়ে পাঠানো কঠিন ছিল। মোহাম্মাদিয়া বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। গ্রামের কাছেই শিক্ষার সুযোগ তৈরি হওয়ায় শিশুরা বিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।
বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির সভাপতি আব্দুস সামাদ বলেন, ‘এই স্কুলটি আমাদের এলাকার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এখানে নিয়মিত শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা করাচ্ছেন। বিদ্যালয়ের শিক্ষার মানও ভালো। তবে অবকাঠামোগত কিছু সমস্যা রয়েছে। একটি পাকা ভবনসহ প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে শিক্ষার্থীদের ফলাফল ভবিষ্যতে আরও ভালো হবে।’
তিনি আরও বলেন, শিক্ষকেরা দীর্ঘদিন ধরে বেতন ছাড়াই দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁদের আর্থিক দুরবস্থার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সরকারি সহায়তা ও বেতন-ভাতার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
কয়রা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা তপন কুমার কর্মকার বলেন, ‘বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান ভালো। ওই এলাকায় একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করা খুবই প্রয়োজন ছিল। সম্প্রতি বিদ্যালয়টি নিবন্ধিত হয়েছে। তাদের পড়ালেখার মান সন্তোষজনক।’
তবে বিদ্যালয়টির সামনে এখনো রয়েছে নানা চ্যালেঞ্জ। ২২১ শিক্ষার্থীর জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত শ্রেণিকক্ষ, পর্যাপ্ত বেঞ্চ, বৈদ্যুতিক পাখা ও একটি পাকা ভবন। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন বিনা বেতনে পাঠদান করা শিক্ষকদের বেতন-ভাতার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
দুই দশকের বেশি সময় ধরে সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও বিদ্যালয়টি প্রত্যন্ত এলাকার শিশুদের শিক্ষার সুযোগ করে দিচ্ছে। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি এবং শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার পরিবেশ আরও উন্নত হবে। টিনশেড ঘরে পাঠ নেওয়া ২২১ শিক্ষার্থীর স্বপ্ন পূরণে এখন প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ।
নিজস্ব প্রতিবেদক, খুলনা 



















