Lama ০৫:৫৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মিরসরাইয়ে পাহাড়ি ঢলে বিপর্যস্ত জনজীবন, বিদ্যুৎহীন অনেক এলাকা

  • Reporter Name
  • Update Time : ০১:০৩:৪৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬
  • ২১ Time View

মিরসরাই সংবাদদাতা:

চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে টানা ছয় দিনের ভারী বর্ষণে অধিকাংশ এলাকার মানুষ পানিবন্দি। বাড়ি-ঘরে পানি থাকায় মানবেতর জীবন যাপন করছেন অনেক মানুষ। সরকারি-বেসরকারিভাবে খাদ্য সামগ্রী পৌঁছে দিলেও তা চাহিদার তুলনায় একেবারে নগণ্য। দুই উপজেলার বসতবাড়ি, দোকানপাট ও নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। বেশী কষ্টে রয়েছে স্বল্প আয়ের মানুষ।

প্রায় এক সপ্তাহ ধরে কর্মহীন থাকায় পরিবার নিয়ে অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটছে তাদের। অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ খুঁটি ভেঙে এবং তার ছিঁড়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। পানিতে ডুবে রয়েছে আউশ রোপা। ঢলের পানিতে ভেসে গেছে আমন বীজতলা।

সরেজমিন ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মিরসরাই উপজেলার খৈয়াছরা ইউনিয়নের কয়েকটি এলাকা, ইছাখালী ইউনিয়ন, মিরসরাই পৌরসভা ও বারইয়ারহাট পৌরসভার কিছু এলাকা, কাটাছরা, দুর্গাপুর, হাইতকান্দি, ওয়াহেদপুর ইউনিয়নের কিছু এলাকার বাড়ি-ঘরে পানি দেখা গেছে। তলিয়ে গেছে একাধিক রাস্তাঘাট। ঘরে পানি ঢুকে পড়ায় অনেক পরিবারে রান্না করা সম্ভব হয়নি। আউশ রোপাসহ নানা ধরনের শাক-সবজি পানির নিচে তলিয়ে গেছে।

উপজেলার মাইজগাঁও গ্রামের কৃষক মোশারফ হোসেন বলেন, ‘আউশের রোপা এখনো পানির নিচে। ১০ শতক জমিতে আমনের বীজতলা তৈরি করেছিলাম, পাহাড়ি ঢলের স্রোতে তলিয়ে গেছে। বৃষ্টি কমলে নতুন করে বীজতলা তৈরি করতে হবে।’

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, টানা বৃষ্টিতে অনেক এলাকায় পানি নামার সুযোগ না থাকায় জলাবদ্ধতা বাড়ছে। কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন। প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে কেউ বের হচ্ছে না।

উপজেলার দক্ষিণ ওয়াহেদপুর এলাকার বোরহান উদ্দিন, ইমাম হোসেন সহ একাধিক বাসিন্দা অভিযোগ করেন, চিটাগাং ফিডমিল কর্তৃপক্ষ পানি নিষ্কাশনের একটি কালভার্ট সংকুচিত করে দেওয়ার কারণে আমাদের এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। এখন গ্রামে কোমর পর্যন্ত পানি। তাদের বারবার বলার পরও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

বিজ্ঞাপন

মিরসরাই উপজেলার নিজামপুর এলাকার আমজাদ হোসেন বলেন, ‘পাহাড়ি ঢলে আমাদের এলাকার রাস্তা ভেঙে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। মূলত ছরা দখল হয়ে যাওয়ার কারণে পাহাড়ি ঢল আটকে রাস্তা-ঘাট ভেঙে পানি মানুষের জমিতে ঢুকে যাচ্ছে।’

এদিকে, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদফতর। এ কারণে এখানকার পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের ঝুঁকিও বেড়েছে। বিশেষ করে পাহাড়ের পাদদেশ ও ঢালু এলাকায় বসবাসকারী পরিবারগুলোকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

ইছাখালী ইউনিয়নের বাসিন্দা ইকবাল হোসেন বলেন, ‘পানি যাওয়ার পথ বন্ধ হওয়ার কারণে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। মানুষ অপরিকল্পিতভাবে বাড়ি-ঘর, দোকানপাট
কারখানা স্থাপনের কারণে এমনটা হয়েছে।’

মিরসরাই উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. ইসমাইল হোসেন জানান, টানা বৃষ্টির কারণে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে উপজেলার অনেক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মানবেতর জীবন কাটানো প্রায় তিন হাজার পরিবারের তালিকা করেছি। ইতোমধ্যে কিছু পরিবারের মাঝে শুকনো খাবার তুলে দেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য পরিবারগুলোর মাঝে খাবার পৌঁছে দেওয়া হবে। এছাড়া যেসব রাস্তা-ঘাট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেগুলোর তালিকাও করা হচ্ছে।

মিরসরাই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা প্রতাপ চন্দ্র রায় বলেন, ‘টানা বৃষ্টিতে অনেক জমির আউশ রোপা পানির নিচে রয়েছে। নষ্ট হয়েছে আমনের বীজতলাও। অনেক কৃষক আমন বীজ তৈরি করেও বৃষ্টির জন্য জমিতে ফেলতে পারছেন না। শাকসবজিরও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানান তিনি।’

চট্টগ্রাম পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-৩ এর মিরসরাই জোনাল অফিসের ডিজিএম আদনান আহমেদ চৌধুরী জানান, উপজেলার আবুতোরাব খেয়ারহাট, ঘড়িমার্কেট এলাকায় বড় গাছ পড়ে খুঁটি ভেঙে যাওয়ায় বিদ্যুৎ লাইন বন্ধ রয়েছে। ঠিকাদারের মাধ্যমে নতুন খুঁটি এনে কাজ করাতে সময় লাগবে। ওই এলাকার গ্রাহকদের ধৈর্য ধারণ করার অনুরোধ করছি।
মিরসরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সোমাইয়া আক্তার বলেন, ‘টানা বর্ষণের কারণে উপজেলার কিছু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা কিছুটা দুর্বল হওয়ায় পানি নামতে সময় লাগছে। জলাবদ্ধতার শিকার মানুষের মাঝে খাদ্য সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া পাহাড়ে ঝুঁকিতে বসবাস করা লোকজনকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে মাইকিং করে সতর্ক করা হয়েছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

মাইসছড়ি বিএনপি’র নবনির্বাচিত কমিটির সৌজন্য সাক্ষাৎ, ফুলেল শুভেচ্ছায় মুখর মহালছড়ি উপজেলা বিএনপির কার্যালয়

Bandarban Tribune

মিরসরাইয়ে পাহাড়ি ঢলে বিপর্যস্ত জনজীবন, বিদ্যুৎহীন অনেক এলাকা

Update Time : ০১:০৩:৪৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬

মিরসরাই সংবাদদাতা:

চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে টানা ছয় দিনের ভারী বর্ষণে অধিকাংশ এলাকার মানুষ পানিবন্দি। বাড়ি-ঘরে পানি থাকায় মানবেতর জীবন যাপন করছেন অনেক মানুষ। সরকারি-বেসরকারিভাবে খাদ্য সামগ্রী পৌঁছে দিলেও তা চাহিদার তুলনায় একেবারে নগণ্য। দুই উপজেলার বসতবাড়ি, দোকানপাট ও নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। বেশী কষ্টে রয়েছে স্বল্প আয়ের মানুষ।

প্রায় এক সপ্তাহ ধরে কর্মহীন থাকায় পরিবার নিয়ে অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটছে তাদের। অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ খুঁটি ভেঙে এবং তার ছিঁড়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। পানিতে ডুবে রয়েছে আউশ রোপা। ঢলের পানিতে ভেসে গেছে আমন বীজতলা।

সরেজমিন ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মিরসরাই উপজেলার খৈয়াছরা ইউনিয়নের কয়েকটি এলাকা, ইছাখালী ইউনিয়ন, মিরসরাই পৌরসভা ও বারইয়ারহাট পৌরসভার কিছু এলাকা, কাটাছরা, দুর্গাপুর, হাইতকান্দি, ওয়াহেদপুর ইউনিয়নের কিছু এলাকার বাড়ি-ঘরে পানি দেখা গেছে। তলিয়ে গেছে একাধিক রাস্তাঘাট। ঘরে পানি ঢুকে পড়ায় অনেক পরিবারে রান্না করা সম্ভব হয়নি। আউশ রোপাসহ নানা ধরনের শাক-সবজি পানির নিচে তলিয়ে গেছে।

উপজেলার মাইজগাঁও গ্রামের কৃষক মোশারফ হোসেন বলেন, ‘আউশের রোপা এখনো পানির নিচে। ১০ শতক জমিতে আমনের বীজতলা তৈরি করেছিলাম, পাহাড়ি ঢলের স্রোতে তলিয়ে গেছে। বৃষ্টি কমলে নতুন করে বীজতলা তৈরি করতে হবে।’

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, টানা বৃষ্টিতে অনেক এলাকায় পানি নামার সুযোগ না থাকায় জলাবদ্ধতা বাড়ছে। কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন। প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে কেউ বের হচ্ছে না।

উপজেলার দক্ষিণ ওয়াহেদপুর এলাকার বোরহান উদ্দিন, ইমাম হোসেন সহ একাধিক বাসিন্দা অভিযোগ করেন, চিটাগাং ফিডমিল কর্তৃপক্ষ পানি নিষ্কাশনের একটি কালভার্ট সংকুচিত করে দেওয়ার কারণে আমাদের এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। এখন গ্রামে কোমর পর্যন্ত পানি। তাদের বারবার বলার পরও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

বিজ্ঞাপন

মিরসরাই উপজেলার নিজামপুর এলাকার আমজাদ হোসেন বলেন, ‘পাহাড়ি ঢলে আমাদের এলাকার রাস্তা ভেঙে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। মূলত ছরা দখল হয়ে যাওয়ার কারণে পাহাড়ি ঢল আটকে রাস্তা-ঘাট ভেঙে পানি মানুষের জমিতে ঢুকে যাচ্ছে।’

এদিকে, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদফতর। এ কারণে এখানকার পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের ঝুঁকিও বেড়েছে। বিশেষ করে পাহাড়ের পাদদেশ ও ঢালু এলাকায় বসবাসকারী পরিবারগুলোকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

ইছাখালী ইউনিয়নের বাসিন্দা ইকবাল হোসেন বলেন, ‘পানি যাওয়ার পথ বন্ধ হওয়ার কারণে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। মানুষ অপরিকল্পিতভাবে বাড়ি-ঘর, দোকানপাট
কারখানা স্থাপনের কারণে এমনটা হয়েছে।’

মিরসরাই উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. ইসমাইল হোসেন জানান, টানা বৃষ্টির কারণে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে উপজেলার অনেক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মানবেতর জীবন কাটানো প্রায় তিন হাজার পরিবারের তালিকা করেছি। ইতোমধ্যে কিছু পরিবারের মাঝে শুকনো খাবার তুলে দেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য পরিবারগুলোর মাঝে খাবার পৌঁছে দেওয়া হবে। এছাড়া যেসব রাস্তা-ঘাট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেগুলোর তালিকাও করা হচ্ছে।

মিরসরাই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা প্রতাপ চন্দ্র রায় বলেন, ‘টানা বৃষ্টিতে অনেক জমির আউশ রোপা পানির নিচে রয়েছে। নষ্ট হয়েছে আমনের বীজতলাও। অনেক কৃষক আমন বীজ তৈরি করেও বৃষ্টির জন্য জমিতে ফেলতে পারছেন না। শাকসবজিরও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানান তিনি।’

চট্টগ্রাম পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-৩ এর মিরসরাই জোনাল অফিসের ডিজিএম আদনান আহমেদ চৌধুরী জানান, উপজেলার আবুতোরাব খেয়ারহাট, ঘড়িমার্কেট এলাকায় বড় গাছ পড়ে খুঁটি ভেঙে যাওয়ায় বিদ্যুৎ লাইন বন্ধ রয়েছে। ঠিকাদারের মাধ্যমে নতুন খুঁটি এনে কাজ করাতে সময় লাগবে। ওই এলাকার গ্রাহকদের ধৈর্য ধারণ করার অনুরোধ করছি।
মিরসরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সোমাইয়া আক্তার বলেন, ‘টানা বর্ষণের কারণে উপজেলার কিছু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা কিছুটা দুর্বল হওয়ায় পানি নামতে সময় লাগছে। জলাবদ্ধতার শিকার মানুষের মাঝে খাদ্য সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া পাহাড়ে ঝুঁকিতে বসবাস করা লোকজনকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে মাইকিং করে সতর্ক করা হয়েছে।